Advertisement
E-Paper

কোল থেকে ছিটকেই বেঁচেছে আর এক শিশু

দুর্ঘটনার সময়েই মায়ের কোল থেকে ছিটকে রাস্তার ধারে বাগানে পড়ে গিয়েছিল একরত্তি মেয়েটা। ভাগ্যিস! হেলা পরিবারের কাছে সেটাই এখন এক ফোঁটা সান্ত্বনা। কারণ, ওই ভাবে ছিটকে পড়ার ফলেই ছ’মাসের সুহানি বেঁচে গিয়েছে। যদিও তার নিজের দাদা আর তিন পিসতুতো দাদাকে পিষে দিয়েছে লরি। ওই চার জনের মধ্যে সুহানির এক পিসতুতো দাদা অনু এখনও ভেন্টিলেশনে। বাকি তিন জনই সোমবার মারা গিয়েছে।

প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:৪০
মায়ের সামনে ঘুমন্ত সুহানি। মঙ্গলবার।ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

মায়ের সামনে ঘুমন্ত সুহানি। মঙ্গলবার।ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

দুর্ঘটনার সময়েই মায়ের কোল থেকে ছিটকে রাস্তার ধারে বাগানে পড়ে গিয়েছিল একরত্তি মেয়েটা। ভাগ্যিস! হেলা পরিবারের কাছে সেটাই এখন এক ফোঁটা সান্ত্বনা। কারণ, ওই ভাবে ছিটকে পড়ার ফলেই ছ’মাসের সুহানি বেঁচে গিয়েছে। যদিও তার নিজের দাদা আর তিন পিসতুতো দাদাকে পিষে দিয়েছে লরি। ওই চার জনের মধ্যে সুহানির এক পিসতুতো দাদা অনু এখনও ভেন্টিলেশনে। বাকি তিন জনই সোমবার মারা গিয়েছে।

কী ভাবে বাঁচল সুহানি? সোমবার সকালে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে পুলিশের গাড়ির তাড়া খেয়ে রবীন্দ্রনগর বাসস্টপে লরিটি একটি বাসকে পাশ কাটাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়। মুহূর্তে লরির চাকায় পিষে যায় চার নাবালক। তারা বাসস্টপের পাশে তৈরি একফালি বাগানের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। দানবের মতো লরিটি যখন ধেয়ে আসছে, সে সময়েই সুহানির মা মধু সন্তানকে নিয়ে কোনও রকমে সরে যান। তখনই কোল থেকে ছিটকে পড়ে সুহানি।

দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরে সুহানির মা মধু ও বাবা সন্দীপ হেলা ভেবেছিলেন, আদিত্য, অনু, অর্জুন ও যুগের মতো সুহানিকেও লরিটি পিষে দিয়েছে। এদের মধ্যে সুহানির নিজের দাদা যুগ। আর পিসতুতো দাদাদের মধ্যে অনু এখনও বেঁচে, তবে ভেন্টিলেশনে। তার ডান পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে।

চোখের সামনে লরিতে পিষে ওই চার জনের তালগোল পাকিয়ে যাওয়া, হইচই, গোলমালের মধ্যে মেয়ের কী হয়েছে, বুঝতে পারছিলেন না মধু।

কোনওমতে বেঁচে যাওয়া মেয়েটাকে তুলোর পুঁটলির মতো বুকে আঁকড়ে মঙ্গলবার দুপুরে মধু বসেছিলেন আলমবাজারে, এক আত্মীয়ের বাড়িতে। বললেন, ‘‘বাচ্চাগুলো চাপা পড়ার পরেই গোলমাল শুরু হয়ে গেল। দেখি পুলিশ এসে আমাকে, আমার স্বামীকে আর শাশুড়িকে ঠেলে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছে। বুঝতে পারছিলাম না, মেয়েটাও পিষে গিয়েছে কি না!’’ ওই অবস্থাতেই পুলিশের গাড়িতে উঠে বসতে হয় হেলা দম্পতি ও সন্দীপের মা, প্রৌঢ়া সুমিত্রাদেবীকে। আধ ঘণ্টা পরে স্থানীয় এক জন এসে মধু ও সন্দীপকে জানান, রেলিংয়ের ও পারে ঝোপে একটা বাচ্চা পড়ে আছে। মধু বলেন, ‘‘ছুটে গিয়ে দেখি আমার সুহানিই ওখানে পড়ে। ভগবান বাঁচিয়েছেন, সামান্য ছড়ে যাওয়া ছাড়া ওর আর কিছু হয়নি।’’

ঘটনাচক্রে, সন্দীপ ও মধুর বড় ছেলে ছোটু সে সময়ে রবীন্দ্রনগর বাসস্টপে থাকলেও দুর্ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েছিল। ফলে, ঘটনার আঁচ তার গায়ে পড়েনি।

কিন্তু সুহানিকে হারিয়ে তিনি আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছেন বলে মনে করছেন মধু। সম্ভবত সে জন্যই আত্মীয়দের কেউ এ দিন শিশুটিকে তাঁর কাছ থেকে নিতে চাইলে মধু নারাজ। আরও প্রবল ভাবে মেয়েকে বুকে জাপটে ধরে আনমনে বিড়বিড় করে শুধু বলছেন, ‘‘ভগবান বচায়া, ভগবান বচায়া!’’

একসঙ্গে পরিবারের তিন ছেলের মৃত্যু এবং আর এক জন গুরুতর জখম হওয়ার পরে গোটা পরিবারটির এখনও ছত্রখান দশা। ভেন্টিলেশনে থাকা অনুর এ দিন রক্তের প্রয়োজন হয়েছে। হেলা পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যই হাসপাতালে পড়ে। কয়েক জনের বক্তব্য, ‘‘মধুর ছোট ছেলে যুগ চলে গেল। তবু তো ও ছোটু আর সুহানিকে নিয়ে বাঁচতে পারবে। কিন্তু মালার কী হবে? ওর তিন ছেলের মধ্যে দু’জন থাকল না। অনুটাও শেষ পর্যন্ত বাঁচবে কি না কে জানে!’’

এক আত্মীয় বলছিলেন, ‘‘অনুকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ওর মা কিছু খাবে না বলে পণ করে আছে। কী করি বলুন তো!’’

পাড়াময় এ দিন শুধুই অকালে ঝরে পড়া খুদেদের কথা। পড়শিরা বলছেন, কী ভীষণ দৌড়তে ভালবাসত অনু, আদিত্য আর যুগ। দৌড়ে ছেলেদের পুরস্কার পাওয়ার ছবি একটি স্থানীয় ক্লাবে গিয়ে দেখতে দেখতে এ দিন কান্নায় ভেঙে পড়েন মালা। স্থানীয় কাউন্সিলর পর্ণা দাস বললেন, ‘‘কয়েক মাস আগে ম্যারাথনে সাত কিলোমিটার দৌড়েছিল সাত বছরের যুগ। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, ওই দৌড়টা বরাবরের মতো থেমে গিয়েছে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy