একই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে বারংবার, বিভিন্ন জায়গায়। তবু বন্ধ হচ্ছে না করোনা আক্রান্ত বা করোনার উপসর্গ থাকা রোগীদের মৃত্যুর পরে তাঁদের দেহ নিয়ে ভোগান্তি। রবিবার শ্যামপুকুর ও সোনারপুরে পড়ে ছিল রোগীর দেহ। এ বার বেহালায় প্রায় ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাড়িতেই পড়ে রইল এক প্রৌঢ়ের মৃতদেহ।
মৃতের পরিবারের দাবি, রবিবার রাতে স্বাস্থ্য দফতর এবং সোমবার সকালে স্থানীয় ওয়ার্ড কোঅর্ডিনেটর ও বেহালা থানাকে বিষয়টি জানানো হলেও দুপুর গড়িয়ে যায়। শেষে সাহাপুর মেন রোডের ওই ঘটনার কথা জানতে পেরে হস্তক্ষেপ করেন এলাকার বিধায়ক তথা শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তার পরে এ দিন বিকেল ৩টে নাগাদ দেহ নিয়ে যায় পুরসভা।
মৃতের পরিবার সূত্রের খবর, গত কয়েক দিন ধরে পরিবারের কয়েক জনের জ্বর ও করোনার উপসর্গ থাকায় পারিবারিক চিকিৎসক সবাইকেই করোনা পরীক্ষা করাতে বলেন এবং বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেন। পরীক্ষায় তিন জনের রিপোর্ট পজ়িটিভ আসে। ৬২ বছরের গৃহকর্তার রিপোর্ট আসে রবিবার বিকেলের পরে। তাঁরও জ্বর ছিল। স্বাস্থ্য ভবন থেকে তাঁদের জানানো হয়, আপাতত ওই প্রৌঢ় বাড়িতেই থাকতে পারেন। শ্বাসকষ্ট হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। কিন্তু ওই রাতেই প্রৌঢ়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং তা বেড়ে যায়। তখন পরিবারের তরফে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা হওয়ার আগেই রাতে তিনি মারা যান।
মৃতের পরিজনেদের দাবি, রাতেই স্বাস্থ্য দফতরে ফোন করেন তাঁরা। সেখান থেকে কয়েকটি ফোন নম্বর দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও নম্বরেই কাউকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।
শেষে পরদিন সকালে পারিবারিক চিকিৎসকের পাশাপাশি স্থানীয় ১১৯ নম্বর ওয়ার্ড কোঅর্ডিনেটরের সাহায্য চেয়েও সুরাহা হয়নি বলে অভিযোগ। এমনকি, প্রৌঢ় কোভিডে মারা যাওয়ায় পারিবারিক চিকিৎসকও ডেথ সার্টিফিকেট দিচ্ছিলেন না বলে দাবি পরিবারের। শেষে বেহালা থানায় খবর দেন তাঁরা। তাতেও লাভ হয়নি।
পরিজনেদের দাবি, পুরসভা থেকে ফোন করে সব জানার পরে তাঁদের বলা হয়, প্রৌঢ়ের ডেথ সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করতে। তাঁদের প্রশ্ন, করোনা রোগী শুনে চিকিৎসকই যদি ডেথ সার্টিফিকেট দিতে রাজি না হন, তা হলে তাঁরা তা পাবেন কোথায়? শেষে আবার থানার শরণাপন্ন হতে হয় তাঁদের। থানা করোনার রিপোর্ট দেখে শুরু করে ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড়ের কাজ। এর মধ্যেই খবর পৌঁছয় এলাকার বিধায়ক তথা মন্ত্রী পার্থবাবুর কাছে। তিনি বলেন, “আমি বিষয়টি জানতে পেরে ডিসি এবং থানার ওসিকে বলি ব্যবস্থা করতে।”
দুপুর দেড়টা নাগাদ বেহালা থানার দুই অফিসার ডেথ সার্টিফিকেটের কাগজপত্র নিয়ে মৃতের বাড়িতে পৌঁছন। কিন্তু তখনও পুরসভার কোনও গাড়ি আসেনি। শেষে বিকেল ৩টে নাগাদ পুরসভার গাড়ি এসে দেহ নিয়ে যায়।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বাড়িতে কারও মৃত্যু হলে তা পুলিশ বা ওয়ার্ড কোঅর্ডিনেটরের মাধ্যমে স্বাস্থ্য দফতর এবং পুরসভা জানতে পারে। তার পরে পুরসভা গাড়ি পাঠিয়ে দেহ সৎকারের জন্য নিয়ে যায়। তা হলে এ ক্ষেত্রে ১৫ ঘণ্টা লাগল কেন? ওয়ার্ড কোঅর্ডিনেটর অশোকা মণ্ডলের দাবি, ওই পরিবারের সদস্যেরা যে করোনায় আক্রান্ত, তা তিনি জানতেন না। তাঁর পাল্টা দাবি, “সকালে পাড়ার এক জন এসে বলল, ওই বাড়িতে করোনায় এক প্রৌঢ় মারা গিয়েছেন। তখন আমি পুরসভা, প্রাক্তন মেয়র ও প্রাক্তন ডেপুটি মেয়রকে ফোন করে সব জানাই।” পুলিশের দাবি, তারা পুরসভায় বার বার জানানো সত্ত্বেও গাড়ি পাঠানো হয়নি। পরে মন্ত্রী হস্তক্ষেপ করায় কাজ হয়।
পুর প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য অতীন ঘোষ বলেন, “আমরা জানতাম না যে, ওই ব্যক্তি করোনায় মারা গিয়েছেন। এ সব ক্ষেত্রে ডেথ সার্টিফিকেট না-থাকলে অস্বাভাবিক মৃত্যু ধরে নিয়ে দেহ ময়না-তদন্তে পাঠানো হয়। আর করোনায় মৃত্যু হলে ডেথ সার্টিফিকেটে তা লেখা থাকতে হবে। সেটাই এখানে পেতে দেরি হয়েছিল। আমরা জানার পরেই গাড়ি পৌঁছে যায়।”
কিন্তু তার পরেও এত দেরি কেন? অতীনবাবু জানান, করোনায় মৃতদের জন্য যে ক’টি শববাহী গাড়ি আছে, তা আর যথেষ্ট নয়। সাংসদ ও বিধায়ক তহবিলের টাকায় কেনা যে সব গাড়ি মৃতদেহ বহন করে, সেগুলিকেও এই কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে।