Advertisement
E-Paper

হাতে হাতে ১০ লাখের চেক! এখনও প্রিয়জনের দেহাংশটুকু পেল না আনন্দপুরের আগুনে মৃতদের পরিবার, নিখোঁজ ২৭

প্রাণে বাঁচতে কেউ দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ মৃত্যু নিশ্চিত বুঝে শেষ বার ফোন করেছিলেন বাড়িতে। আনন্দপুরের সেই অগ্নিকাণ্ডের পর ২৪ দিন কেটে গিয়েছে। এখনও কারও দেহ পায়নি পরিবার।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৯
Family members of Anandapur fire victims received compensation not body yet

আনন্দপুরের সেই ভস্মীভূত গুদামের সামনে দমকলকর্মীরা। ছবি: পিটিআই।

এক এক করে ২৪টা দিন কেটে গিয়েছে। আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের কাউকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি! পরিবার পায়নি প্রিয়জনের দেহাংশটুকুও। অথচ পরিজনদের হাতে এসে গিয়েছে ‘ক্ষতিপূরণের’ চেক! প্রিয়জনকে হারিয়ে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে ২৭টি পরিবার। কিন্তু যাঁর বা যাঁদের জন্য ক্ষতিপূরণ, তাঁর বা তাঁদের মৃত্যুর সরকারি নিশ্চয়তাই এখনও আসেনি! আশ্চর্য নয় যে, তাঁদের পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম নিয়ে ধন্দে পরিবারের সদস্যেরা।

গত ২৫ জানুয়ারি রাতে আনন্দপুরের নাজিরাবাদে পর পর দু’টি গুদামে আগুন লেগেছিল। ভিতরে আটকে পড়েছিলেন রাতের ডিউটিতে থাকা কর্মচারী এবং নিরাপত্তারক্ষীরা। প্রাণে বাঁচতে কেউ কেউ দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ মৃত্যু নিশ্চিত বুঝে শেষ বার ফোন করেছিলেন বাড়িতে। দমকলের দীর্ঘক্ষণের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে পরদিন বেলার দিকে। ভস্মীভূত গুদাম থেকে একের পর এক দেহাংশ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু কারও পরিচয় তো দূরের কথা, কোন অঙ্গ উদ্ধার হচ্ছে, তা-ই বোঝা যায়নি। মোট ২৭টি নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে থানায়। বারুইপুর মহকুমা পুলিশ দেহাংশগুলি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে। ২৭টি পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে ডিএনএ নমুনা। কিন্তু মৃতের সংখ্যা নিশ্চিত করে বলা যায়নি।

আগুন নেবার পর আনন্দপুরের গুদামে পুলিশ।

আগুন নেবার পর আনন্দপুরের গুদামে পুলিশ। ছবি: পিটিআই।

আনন্দপুরের ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছিল রাজ্য সরকার। ভস্মীভূত গুদামের মধ্যে একটি ছিল ‘ওয়াও মোমো’ সংস্থার। তারা পৃথক ভাবে তাদের তিন কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। সম্প্রতি সেই সমস্ত পরিবারের হাতে ১০ লক্ষ টাকার চেক পৌঁছে গিয়েছে। কোথাও চেক দিয়েছেন জেলাশাসক, কোথাও স্থানীয় কোনও নেতা। কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার আগেই ক্ষতিপূরণ এল কেন, সে প্রশ্নও উঠেছে।

অগ্নিকাণ্ডে নিজের ভাই আর ছেলেকে হারিয়েছেন মেদিনীপুরের নিরঞ্জন মণ্ডল। তাঁর ভাই গোবিন্দ মণ্ডল (৩৯) এবং ছেলে রামকৃষ্ণ মণ্ডল (১৮) আনন্দপুরের গুদামে কাজ করতেন। ক্ষতিপূরণের চেক হাতে নিরঞ্জন বললেন, ‘‘টাকা তো পেলাম, কিন্তু আমাদের কষ্ট হচ্ছে খুব। এখনও চেকে হাত দিইনি। চাকরিও তো দেবে বলেছিল। আগে তো দেহ পাই! দেহ দেওয়ার আগে টাকা কেন দিল, বুঝতে পারছি না।’’ আপাতত স্থানীয় পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলে পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের দিন স্থির করে ফেলেছেন নিরঞ্জনেরা। আগামী ১৪ মার্চ শ্রাদ্ধশান্তির আয়োজন করা হবে। তার আগে পুলিশের ফোনের অপেক্ষায় গোটা পরিবার।

বিধ্বংসী আগুনে ভস্মীভূত আনন্দপুরের দু’টি গুদাম।

বিধ্বংসী আগুনে ভস্মীভূত আনন্দপুরের দু’টি গুদাম। ছবি: পিটিআই।

ঝাড়গ্রামের রবীশ হাঁসদার পরিবারেও একই ছবি। আনন্দপুরে ‘ওয়াও মোমো’র গুদামের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন রবীশ। ঘটনার পর থেকে ভাইয়ের চিহ্নও দেখতে পাননি তাঁর দাদা। দেহ না পাওয়ায় শ্রাদ্ধের কাজও করতে পারেননি। এখনও অশৌচের নিয়ম পালন করে চলছেন। তাঁর কথায়, ‘‘এত দিনেও দেহ পাওয়া গেল না! থানায় বার বার ফোন করছি। আমাদের ঝাড়গ্রাম থেকে তো রোজ কলকাতায় গিয়ে খোঁজ নেওয়া সম্ভব নয়! পুলিশ জানিয়েছে, কবে দেহ পাওয়া যাবে, তা পরে জানাবে। আমরা এখনও নিয়ম মানছি। ঘরে আগুন জ্বালতে পারছি না। এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আমাদের খাবার দিয়ে যাচ্ছে।’’ মোমো সংস্থার আরও যে দু’জন কর্মচারী নিখোঁজ, তাঁদের পরিবারের সদস্যেরা দেহাংশ দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি রবীশের দাদার। তাঁর কথায়, ‘‘বাকি দু’জনের পরিবার তো তা-ও কিছু দেখতে পেয়েছে। আমরা (দেহের) কিছুই দেখতে পাইনি।’’

ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে ধন্দে মেদিনীপুরের জন্মেজয় দিন্ডা। আনন্দপুরে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাঁর ভাইপো দেবাদিত্য দিন্ডা নিখোঁজ। কিন্তু ১০ লাখ টাকার চেক কারা দিল, তা এখনও তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়। জন্মেজয়ের কথায়, ‘‘দেহটা যত ক্ষণ না পাচ্ছি, চিন্তায় আছি। পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। ১০ লক্ষ টাকার একটা চেক আমরা পেয়েছি। তাতে মোমো সংস্থা এবং গুদামের মালিক গঙ্গাধর দাসের নাম রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পরে কি আবার টাকা দেওয়া হবে? সেটা বুঝতে পারছি না।’’

পুলিশ এখনও আনন্দপুর থেকে উদ্ধারকৃত দেহাংশগুলির ডিএনএ রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে।ফরেনসিক বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে। তবে পুলিশ সূত্রের দাবি, এই ধরনের ডিএনএ পরীক্ষায় অতিরিক্ত কিছু সময় লাগে। যেহেতু দেহাংশগুলির কোনটা কী তা বোঝা যাচ্ছে না, তাই ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া শনাক্তকরণের অন্য কোনও উপায় নেই।

গুদামে সংরক্ষিত পানীয়ের বোতল ভস্মীভূত।

গুদামে সংরক্ষিত পানীয়ের বোতল ভস্মীভূত। ছবি: পিটিআই।

আনন্দপুরের ঘটনায় মোট তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ভস্মীভূত গুদামের মালিক গঙ্গাধর ছাড়াও পুলিশ গ্রেফতার করেছিল ‘ওয়াও মোমো’র গুদামটির ম্যানেজার মনোরঞ্জন শিট এবং ডেপুটি ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তীকে। তিন জনই আপাতত জেলে। আগুনের গ্রাস থেকে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলেন মাত্র দু’জন। পুলিশ তাঁদের সঙ্গেও কথা বলেছে। এ ছাড়া, ‘ওয়াও মোমো’র দফতরের মালিক ও অন্য কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং তাঁদের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে।

২৫ তারিখ রাতে আনন্দপুরের গুদামে ঠিক কত জন ছিলেন, সেই সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেননি কর্মচারীরা। সকলের দেহাংশ কি মিলেছে? নিখোঁজ ডায়েরিতে নাম থাকা ২৭ জনের বাইরেও কি কেউ গুদামে ছিলেন? কেউ কি সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন? সে সব প্রশ্নও রয়েছে। তবে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট অনেক জট খুলে দিতে পারবে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।

কিন্তু সে রিপোর্ট কবে পাওয়া যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তত দিন মেদিনীপুরের নিরঞ্জন মণ্ডলের পরিবারের দিন কাটবে ক্ষতিপূরণের চেকের দিকে তাকিয়ে। ঝাড়গ্রামের রবীশ হাঁসদার পরিবার দৈনন্দিন অশৌচ পালন করে চলবে। তাঁদের বাড়িতে আগুন জ্বালানো হবে না। খাবার আসবে আত্মীয়দের বাড়ি থেকে। তত দিন ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে ধন্দে থাকবে মেদিনীপুরের দেবাদিত্য দিন্ডার পরিবার।

Kolkata fire Anandapur Fire Incident Burn Victim
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy