মুর অ্যাভিনিউয়ে দু’কামরার একতলা একটি বাড়িতে মা আর ভাইকে নিয়ে সংসার ছিল আমার। এক বছর আগে ঘূর্ণিঝড়ের সন্ধ্যায় আমি ওই বাড়িতেই একা হয়ে গিয়েছিলাম। আমপান শহরের উপর দিয়ে যাবে জানতাম। তবে ঝড়ের তীব্রতা যে অতটা বেশি হবে, আন্দাজ করতে পারিনি। আগে থেকে বুঝতে পারলে হয়তো অন্য কোথাও চলে যেতে পারতাম। চোখের সামনে মা আর ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু দেখতে হত না তা হলে।
আমাদের বাড়িটা ২০-২৫ বছরের পুরনো। খুব খারাপ অবস্থা ছিল না। তবে ঝড়ের সন্ধ্যায় ৬টা নাগাদ এক দিকের একটা চাঙড় খসে পড়ে। মা তখন রান্নাঘরে। ভাই বিছানায় শুয়ে। আমি ছিলাম ঘরের অন্য প্রান্তে। নিজেরা আলোচনা করছিলাম, চা খেয়ে অন্য কোথাও চলে যাব কি না। তবে বাইরে তখন ঝড়ের দাপট ক্রমশ বাড়ছে। বেরিয়ে যাবই বা কোথায়? এর মধ্যেই তীব্র একটা আওয়াজ হল। মা যে দিকে চা করছিল, সে দিকের পুরো দেওয়ালটা হুড়মুড় করে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই ভেঙে পড়ল। চাপা পড়ে গেল মা আর ভাই। এ দিক-ও দিক থেকে ইট ছিটকে এসে পড়ে আমার উপরেও। মাথা ফেটে যায় আমার।
বাড়ি তখন অন্ধকার। প্রথমে হতভম্ব হয়ে মেঝের উপরে পড়ে ছিলাম কিছু ক্ষণ। পরে আস্তে আস্তে অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে শুধু ভাঙা দেওয়ালই দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা জায়গা থেকে শুধু ভাইয়ের হাতের কিছুটা অংশ চোখে পড়ছিল। ওই ভাবেই বসে থাকি ঘরের মধ্যে। নড়ার কোনও উপায় ছিল না। দেওয়ালের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মা আর ভাইকে যে উদ্ধার করব, সেই ক্ষমতাও ছিল না। তখন ঝড়ের গতি আরও বেড়েছে। ঝড় থামার পরে পুলিশ আসে। জানতে পারি, তখন রাত ১০টা। মা ও ভাই যে আর বেঁচে নেই, সেই আশঙ্কাটা হচ্ছিলই। পুলিশ দেওয়াল সরানোর পরে মাকে চেনার মতো অবস্থাতেও পাইনি। ভাইকে নিয়ে ক্ষীণ একটা আশা তবু মনের মধ্যে জেগে ছিল। তবে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে গেলে ওরও মৃত্যু হয়েছে জানানো হয়।
আমাদের বাড়ির পাশের পাঁচিলটা ছিল প্রায় সাত-আট ফুট উঁচু। তার উপরে বসানো ছিল কিছু লোহার অ্যাঙ্গল। ঝড়ের দাপটে সেটাই সটান ভেঙে এসে পড়েছিল দেওয়ালের উপরে। অত উঁচু পাঁচিলের ধাক্কা সামলাতে পারেনি বাড়ির দেওয়াল। মা দেওয়ালের ধারেই ছিল। সব চেয়ে বেশি আঘাত মায়ের উপরেই পড়ে।
এক বছর কেটে গেলেও মা আর ভাইয়ের মৃত্যুর কোনও ক্ষতিপূরণ পাইনি। তালিকায় ওদের দু’জনের নাম ছিল শুনেছি। বাড়িটা পুরো ভেঙে গিয়েছিল। জিনিসপত্রও সব নষ্ট হয়ে যায়। জমানো টাকা দিয়ে সেখানেই নিজের মাথা গোঁজার একটা ব্যবস্থা করেছি। একটা সেন্টারের গাড়ি চালাতাম। গত বছরের লকডাউন থেকেই কাজ নেই। আতঙ্কে মানুষও বাইরের গাড়ি ভাড়া নেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। আমার মতো অনেক চালকই বসে আছেন কাজের আশায়।
এ বছরও আবার ঝড় আসছে। এই বাড়িতেই একা থাকব। যাওয়ার তো জায়গা নেই। তবে যাঁরা পুরনো বাড়িতে থাকেন, তাঁদের বলব, সুযোগ পেলে অন্য কোথাও সরে যান, অন্তত প্রাণে বাঁচবেন।