E-Paper

ন্যূনতম মজুরি থেকে স্বাস্থ্য, অপ্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন বাজেটে ব্রাত্য গৃহশ্রমিক মেয়েদের

কেরল, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার মতো একাধিক রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হলেও এ রাজ্যে অতীতে কোনও সরকারই এ বিষয়ে পদক্ষেপ করেনি। তাই গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে আন্দোলনে নামেন গৃহসহায়িকা ও পরিচারিকাদের বড় অংশ।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ ০৭:৪২

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

যে সরকারের প্রতিমন্ত্রী নিজেই অতীতে পরিচারিকার কাজে যুক্ত ছিলেন, তাদেরই প্রথম বাজেটে স্থান পেল না গৃহসহায়িকা ও পরিচারিকাদের বিষয়! ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, পেনশন, মাতৃত্বের ছুটি বা সন্তানকে ক্রেশে রেখে কাজে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া তো দূর, তাঁদের শ্রমিকের মর্যাদাও থেকে গেল অধরাই। যা নিয়ে গৃহসহায়িকা, পরিচারিকাদের বড় অংশেরই দাবি, এ রাজ্যে কর্মরত মেয়েদের বৃহত্তম গোষ্ঠী হল গৃহশ্রমিক মেয়েরা। শিল্প, কৃষি ও খনিতে নিয়োগ যত কমেছে, তত ভিড় বেড়েছে গৃহশ্রমে। কেন্দ্রীয় ই-শ্রম পোর্টালেই এ রাজ্যের ৫২ লক্ষ গৃহশ্রমিকের নাম উঠেছে। তবু তাঁদের বিষয়ে একটি শব্দও খরচ হল না বাজেটে! ‘পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি’র সদস্য স্বপ্না ত্রিপাঠীর মন্তব্য, ‘‘এই সরকারের প্রতিমন্ত্রী কলিতা মাজি নিজেই যে হেতু পরিচারিকা ছিলেন, তাই এই বাজেট নিয়ে আশা ছিল। আশাহত হওয়া ছাড়া কিছুই পেলাম না।’’

কেরল, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার মতো একাধিক রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হলেও এ রাজ্যে অতীতে কোনও সরকারই এ বিষয়ে পদক্ষেপ করেনি। তাই গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে আন্দোলনে নামেন গৃহসহায়িকা ও পরিচারিকাদের বড় অংশ। জানা যায়, যে হেতু লিখিত চুক্তি থাকে না, তাই কেউ কাজ করিয়েও টাকা না-দিলে সে বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পুলিশে গিয়েও লাভ হয় না। ইউনিয়নে যুক্ত শ্রমিক না হওয়ায় শ্রম দফতরও তাঁদের সঙ্গে কথা বলে না। স্বপ্না বললেন, ‘‘বহু চেষ্টা করে তাই ২০১৮ সালে একটি ইউনিয়ন নথিভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এখন আর ইউনিয়নের নবীকরণ করা হচ্ছে না। এ নিয়ে আমাদের আইনি লড়াই লড়তে হচ্ছে। তবে, শ্রম কমিশনে দরবার করে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করার জন্য কমিটি তৈরি করানো গিয়েছিল। ঘণ্টা-প্রতি মজুরি নির্ধারণ করার ফর্মুলাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার পরে আর কিছু হয়নি। উল্টে, এক মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, তোমাদের নিয়ে কিছু করলে ঘরে ঘরে মানুষ বিরুদ্ধে চলে যাবে। তার চেয়ে বরং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে নাম লেখাও।’’

জীবনে এক সময়ে পরিচারিকার কাজ করার পরে বর্তমানে রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী, আউশগ্রামের বিধায়ক কলিতা মাজিও বললেন, ‘‘এ রাজ্যে মহিলাদের নিরাপত্তা ছিল না, সেটা পাওয়া যাবে। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পেও তো বরাদ্দ বাড়ল। সেটা কম নাকি?’’ স্বপ্নাদের অবশ্য প্রশ্ন, টাকা হয়তো কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু তাতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই লক্ষ লক্ষ মেয়ের শ্রমিক পরিচয়টা কি থাকবে? শ্রমিকের স্বীকৃতি না দিলে অধিকারের দাবি তোলার জমিটাই তো থাকে না। যে বিপুল পরিমাণ অ-সুরক্ষার মধ্যে তাঁদের দিন কাটাতে হয়, সেখানে সামাজিক সুরক্ষার কয়েকশো টাকা কতটুকু? তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর স্বপ্নাদের নজর ছিল রাজ্য বাজেটের বিভিন্ন ঘোষণার দিকে।

একই দাবির কথা শোনা গেল ‘পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়ন’-এর সম্পাদক ইসমাত আরা খাতুনের গলায়। এ বিষয়ে তিনি বললেন, ‘‘মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরিষেবা দেওয়াই কাজ আশা কর্মীদের। অথচ, বিভিন্ন খেলা, মেলা, নির্বাচন, পরীক্ষা-সহ বাড়তি অনেক কাজ করানো হয়েছে আশা কর্মী এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দিয়ে। কিন্তু ওই সমস্ত অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক তাঁদের দেওয়া হয়নি, শ্রম-সময়ও গ্রাহ্য করা হয়নি। অন্তত চার মাস ধরে উৎসাহ ভাতা বকেয়া রাখা এবং প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন খাতের টাকা বাকি থাকা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ এবং বলিষ্ঠ আন্দোলনের ফল এই বাজেটে পাওয়া গিয়েছে। ৫০০০ টাকা করে বাড়ানো হলেও রাজ্য সরকারের অন্যান্য ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মতো ন্যূনতম মজুরি (স্থায়ী) ১৫ হাজার টাকা করা হল কই? স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের আওতায় আনা, ইএসআই, পেনশন এবং পিএফ পাওয়ার কোনও দাবিই শেষমেশ পূরণ হল না। কোন মাপকাঠিতে এই ৫০০০ টাকা বাড়ল, সেটাও যে হেতু বলা হল না, তাই ভবিষ্যতে ইচ্ছে মতো টাকা বাড়ানোর বা না বাড়ানোর পথও খোলা রইল।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Domestic Workers Budget West Bengal government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy