কারও ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচার আটকে গিয়েছে। কেউ রোগীকে বাঁচানোর জন্য নেগেটিভ আরএইচ ফ্যাক্টরের রক্তের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন। কোথাও আবার থ্যালাসেমিয়া রোগীকেও বলা হচ্ছে, ‘‘দাতা নিয়ে আসুন। পজ়িটিভ রক্তের লোক হলে হবে না, নেগেটিভ গ্রুপের দাতা আনুন।’’ দু’মাস অন্তর রক্ত লাগে যাঁর, তাঁর জন্য চাইলেই রক্তদাতা পাওয়া কি মুখের কথা?
শহরে এই মুহূর্তে এমনই রক্তের, বিশেষত নেগেটিভ গ্রুপের আকাল চলছে বলে অভিযোগ। কার্যত কোনও সরকারি প্রতিষ্ঠানেই মিলছে না এ, বি, ও অথবা এবি নেগেটিভের মতো নেগেটিভ আরএইচ ফ্যাক্টরের রক্ত। সঙ্গে দাতাকে নিয়ে গিয়ে রক্ত দিয়ে তার বদলে রক্তের অনুরোধেও কাজ হচ্ছে না। বলে দেওয়া হচ্ছে, নেগেটিভ রক্ত পেতে হলে নেগেটিভ আরএইচ ফ্যাক্টরের দাতা আনতে হবে। নয়তো সর্বত্র রিকুইজ়িশনে লিখে দেওয়া হচ্ছে, ‘রক্ত নেই। অন্যত্র দেখুন’।
আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাসিন্দা বিমল চৌধুরীর জন্য যেমন ছুটতে হয়েছে তাঁর পরিজনকে। বছর আটচল্লিশের বিমলের ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে। তিনি বাঙুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসে ভর্তি। প্রথম দফার অস্ত্রোপচারের জন্য দু’ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। তাঁর আত্মীয় দেবাংশু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এবি নেগেটিভ রক্ত প্রয়োজন ছিল। এসএসকেএমের ব্লাড ব্যাঙ্ক জানিয়ে দেয়, ওই গ্রুপের রক্ত নেই। শহরের সমস্ত ব্লাড ব্যাঙ্কে ছুটেও রক্ত মেলেনি। শেষে ১৮০০ টাকা দিয়ে রক্ত কিনতে হয়েছে।’’ এর পরে দেবাংশুর দাবি, সম্প্রতি আবার তাঁদের রক্তের প্রয়োজন পড়ে। দু’দিন ধরে ছুটেও কোথাও রক্ত মেলেনি। শেষে সমাজমাধ্যমে লিখে এক দাতার ব্যবস্থা করা যায়। অবশেষে প্রয়োজনীয় রক্ত পান তাঁরা। কিন্তু রক্ত কিনতে হল কেন? রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদের দাবি, ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি দেশে রক্ত বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর জন্য যে কোনও সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে বিনামূল্যে রক্ত পাওয়ার কথা। বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর জন্য সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক রক্ত বাবদ কিছু টাকা নিলেও তা নেয় রক্ত রাখার জন্য ব্যবহৃত ব্যাগ, দাতার রক্তের পরীক্ষা, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং অন্যান্য কয়েকটি খাতে খরচ হিসাবে। কিন্তু বিমলের আত্মীয়দের দাবি, ‘‘পরিস্থিতি এমনই যে, দাম দিয়েই রক্ত কিনতে হয়েছে আমাদের।’’
ও নেগেটিভ রক্ত পেতেও একই রকম হয়রানির অভিযোগ করলেন সর্বাণী দে। তাঁর বোন পারমিতা মুখোপাধ্যায় সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর রক্তে হিমোগ্লোবিন পাঁচের নীচে নেমে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক থ্যালাসেমিয়া রোগী আবার জানালেন, থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ার পরে মেডিক্যাল কলেজগুলিতে নাম নথিভুক্ত করানো যায়। তিনিও করিয়ে রেখেছিলেন। যে হেতু এই ধরনের রোগীদের কারও মাসে এক বা দু’ইউনিট, কারও বা মাসে দু’-তিন বার দুই বা তারও বেশি ইউনিট রক্ত প্রয়োজন হয়, তাই নাম লেখানো থাকলে রক্ত পেতে সুবিধা হয়। এর জন্য ডে-কেয়ার ইউনিট রয়েছে। সেখানে একাধিক শয্যা থাকে, ভর্তির ব্যাপার থাকে না। নথিভুক্ত থাকা রোগী এলে ওই শয্যায় শুইয়ে রক্ত দেওয়া হয়। তাঁর অভিযোগ, ‘‘এখন ভর্তি হয়ে রিকুইজ়িশন নিয়ে আসতে বলা হচ্ছে। ডে-কেয়ারে ভর্তির ব্যাপারই থাকে না, রিকুইজ়িশন দেবেন কে? মাঝেমধ্যেই রক্ত লাগে বলে আমাদের জন্য চাইলেই লোক পাওয়া যায় না।’’
রক্তদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্তেরা জানাচ্ছেন, রাজ্যে ৯০টি সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে কেন? এন আর এস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্তা দিলীপকুমার পণ্ডা বলেন, ‘‘গরমের সময়ে প্রতি বার সমস্যা হয়। এ বার যোগ হয়েছে ভোট। শিবির প্রায় হচ্ছেই না। সমস্যা আরও গভীরে, কারণ ফেব্রুয়ারি থেকে এসআইআর-এর জেরে শিবির প্রায় হয়ইনি।’’ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্তা বিশ্বজিৎ হালদার বললেন, ‘‘নেগেটিভ রক্ত পেতেই মূল সমস্যা। কী করে সামাল দেওয়া যায়, সেটাই ভাবার।’’ রাজ্য রক্ত সঞ্চালন পর্ষদের যুগ্ম-অধিকর্তা বিজয় মুখোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘আমাদের রেয়ার ব্লাড গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট প্রোটোকল আছে। রোগীরা জানেন না বলে সমস্যায় পড়ছেন।’’ কিন্তু রোগীর পরিজনেরা তো ছুটছেন সরকারি হাসপাতালের দেওয়া ‘রক্ত নেই’ লিখে দেওয়া রিকুইজ়িশন নিয়েই..! কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন কেটে দেন তিনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)