Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

KMC election 2021: ‘দোষী’ বেহাল নিকাশি, জমা জলে ক্রমেই বাড়ছে দুর্ভোগ

আর্যভট্ট খান , চন্দন বিশ্বাস
কলকাতা ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ০৬:২২
সমস্যা: বেহালার পাঠকপাড়ায় বৃষ্টির জমা জল ঠেলেই চলছে জনজীবন।

সমস্যা: বেহালার পাঠকপাড়ায় বৃষ্টির জমা জল ঠেলেই চলছে জনজীবন।
ছবি: সুমন বল্লভ।

বাড়ির সামনেই খোলা নর্দমা। আর তা নিয়মিত পরিষ্কার না-হওয়ার ছবিটাও স্পষ্ট! সদ্য ব্লিচিং পাউডার ছড়ানো হয়েছে নর্দমা-সহ রাস্তার দু’পাশে, পরিষ্কার করা হয়েছে নর্দমার সামনের ঝোপজঙ্গল। কিন্তু তার পরেও পড়ে রয়েছে আবর্জনা।

কলকাতা পুরসভার ১৩২ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠকপাড়ায় ডেঙ্গি আক্রান্ত পুরকর্মী দেবু সিংহের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল এই ছবি। সদ্য বিদ্যাসাগর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ডেঙ্গি হওয়ার পরেও বাড়ি-সহ এলাকার এই অবস্থা কেন? দেবুবাবুর স্ত্রী ঊষা সিংহ বলেন, “মাঝেমধ্যে নর্দমা পরিষ্কার করা হয়। সকালেই ব্লিচিং ছড়িয়েছে। কিন্তু আসল সমস্যা তো নর্দমার জল! জল তো নড়েই না! ডেঙ্গি হবে না কেন?’’

করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গির আতঙ্ক রয়েছে গোটা পাঠকপাড়ায়। স্থানীয়েরা জানালেন, দু’-এক পশলা বৃষ্টিতেই এলাকায় জল জমার সমস্যা রয়েছে। শিপ্রা হাজরা নামে এক বাসিন্দা বললেন, “পানীয় জলের সমস্যা নেই। ময়লার গাড়িও আসে। মেয়েদের সুরক্ষা নিয়েও অভিযোগ নেই। তবে বৃষ্টি হলেই জল জমার সমস্যাটা মারাত্মক। তখন ঘরের ভিতরে জল ঢুকে যায়। রাস্তার কলগুলি জলের তলায় চলে গেলে পানীয় জলটুকুও মেলে না। কিন্তু সকলের তো জল কিনে খাওয়ার সামর্থ্য থাকে না।’’ কনক মিত্র নামে আর এক বাসিন্দার মন্তব্য, “হাঁটুজল পেরিয়ে বাজারহাট করতে হয়। জল জমার সমস্যাটা যেন প্রতি বছরই বাড়ছে।”

Advertisement

জমা জলের পাশাপাশি বেআইনি নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে ১৩২ নম্বর ওয়ার্ডের অভয় বিদ্যালঙ্কার রোডে। রয়েছে বাতিস্তম্ভ থেকে বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে থাকা বিদ্যুৎবাহী তার নিয়ে বিস্তর অভিযোগ। আর্য ঘোষ নামে এক বাসিন্দা বললেন, ‘‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে সিইএসসি-র কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে আমাদের পাড়ার জন্য এরিয়াল বান্ডল্ড (এবি) কেব্‌ল লাগিয়েছি। কিন্তু বাকি এলাকার অবস্থা যে কে সে-ই। যে কোনও সময়ে বড় বিপদ হতে পারে।’’ ওই ওয়ার্ডের বিদায়ী কোঅর্ডিনেটর সঞ্চিতা মিত্র অবশ্য বলছেন, ‘‘বেহালায় জল জমার সমস্যা নতুন নয়। নিকাশি নালার সংস্কার করায় পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। আশা করছি, কয়েক মাসের মধ্যেই ওয়ার্ডের পাশের খালটিরও সংস্কার করতে পারব। তা হলেই জমা জল থেকে মুক্তি মিলবে।’’

জমা জলের যন্ত্রণায় ভুগছে কলকাতা পুরসভার ১৪ নম্বর বরোর অধীনস্থ একাধিক ওয়ার্ড। ১২১, ১২৭, ১২৮, ১২৯, ১৩০ ও ১৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা এ জন্য দুষছেন বেহাল নিকাশিকেই। ১৩১ নম্বর ওয়ার্ডের হরিসভা, বনমালী নস্কর রোড, হনুমান মন্দির, কে ডি মুখার্জি রোড সংলগ্ন বাসিন্দাদের অভিযোগ, বৃষ্টি হলেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে এলাকা। সেই জমা জল সহজে সরে না। কে ডি মুখার্জি রোডের মিনতি হালদার বলেন, “পানীয় জল, রাস্তাঘাট নিয়ে অভিযোগ নেই। কিন্তু নর্দমা পরিষ্কার না হওয়ায় বৃষ্টিতে যেমন জমা জল নামে না, তেমনই মশার উপদ্রবও রয়েছে।” তাঁর বাড়ির পাশের একটি পরিত্যক্ত বাড়ি এখন আগাছার জঙ্গল। স্থানীয়দের আবর্জনা ফেলার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটি। বাড়িটি দেখিয়ে মিনতিদেবীর সখেদ মন্তব্য, “মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে ঠিকই, তবে পুরসভারও আরও উদ্যোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।” পুর পরিষেবা না পাওয়ার অভিযোগও করছেন কেউ কেউ। একশো দিনের কর্মীদের রাস্তা সাফাইয়ের কাজে দেখা না-যাওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলছেন তাঁরা। এলাকা ঘুরে দেখা গেল, কোনও কোনও জায়গায় নর্দমা পরিষ্কারের কাজ চলছে বটে, তবে বাকি এলাকার নর্দমায় জমে রয়েছে পাঁক আর কাদামাটি। যা দেখিয়ে এক স্থানীয় বাসিন্দা বললেন, “নর্দমা এ ভাবে ভরে থাকলে বৃষ্টির জল যাবে কী করে? এখন পুরভোটের কথা ভেবেই নর্দমা পরিষ্কার চলছে।”

১৩০ ও ১২৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহীন্দ্র ব্যানার্জি রোড, কাজিপাড়া, জাগরণী, বিবেকানন্দপল্লি, সূর্য সেন পল্লির ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় আবার মাঝে মাঝেই উঠছে বহুতল। জয়রামপুর ডাকঘর সংলগ্ন এলাকার এক বাসিন্দা বললেন, ‘‘বর্ষা এলে সঙ্গে দুর্ভোগও হাজির হয়! ডিসেম্বরে সেই জমা জলের দুর্ভোগটা বুঝতে পারবেন না।’’ জল-যন্ত্রণার কথা মেনে নিয়ে ১২৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিদায়ী কোঅর্ডিনেটর তথা এ বারের তৃণমূল প্রার্থী সংহিতা দাস বলছেন, ‘‘এলাকায় জল জমার সমস্যা অনেকটাই কমেছে। কিছু এলাকায় এখনও সমস্যা আছে, কাজও চলছে। শেষ হলেই এই সমস্যার সমাধান হবে।’’

বীরেন রায় রোড (পশ্চিম) ধরে এগিয়ে গেলেই ১২৮ নম্বর ওয়ার্ডের শকুন্তলা পার্ক এলাকা। বীরেন রায় রোড সংলগ্ন এলাকায় একাধিক বহুতলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সারা বছর ধরেই সেখানে পাইপলাইনের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি লেগে রয়েছে। ফলে রাস্তাও ভরে রয়েছে খানাখন্দে। তা মেরামত করতে তাপ্পি দেওয়া হলেও কয়েক দিন পরেই আবার যে কে সে-ই! বকুলতলা এলাকার একটি আবাসনের সামনেই আবার উপচে পড়ছে ভ্যাট। রয়েছে পানীয় জলের সমস্যাও। ওই ওয়ার্ডের অম্বেডকর কলোনি, বিদ্যাসাগর কলোনি, বঙ্কিমপল্লি এলাকায় প্রতিদিন পুরসভা জলের গাড়ি পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও অভিযোগ, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম। তাই এখন এই জল-সমস্যার স্থায়ী সমাধানই চাইছেন বাসিন্দারা।

বীরেন রায় রোডের ভিতরের দিকে দাসপাড়া, জোড়াপুকুর, শ্যামসুন্দরপল্লির মতো এলাকাগুলিতেও জমা জলের হাত থেকে রেহাই মেলে না। এমনটাই জানালেন স্থানীয় বাসিন্দা পূর্ণিমা পুরকায়স্থ। তাঁর প্রশ্ন, “শ্যামসুন্দরপল্লির মূল রাস্তা থেকে একটু ভিতরের দিকের রাস্তায় পিচ উঠে গিয়েছে। বাড়ির সামনের ছোট ছোট রাস্তাগুলোর মেরামতি কবে হবে?”

বছর দুই আগে ১২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা ১৪ নম্বর বরোর চেয়ারম্যান মানিকলাল চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। সেই ওয়ার্ডেও সমস্যার ছবি প্রায় একই। অভিযোগ, অল্প বৃষ্টিতেই ভেসে যায় ভাসাপাড়া, মজলিশপাড়া এলাকা। ঘরের ভিতরে জল ঢুকে যায়। এমনকি, এলাকার প্রফুল্ল সেন কলোনি, জয়পুর বস্তিগুলিতেও অনুন্নয়নের ছবি স্পষ্ট।

১২৭ নম্বর ওয়ার্ডে, সরশুনার যত্রতত্র দেখা গেল আবর্জনার স্তূপ। কিছু অংশে রয়েছে জল জমার সমস্যা। তবে শকুন্তলা পার্কের বুস্টার পাম্পিং স্টেশন এত দিনেও চালু হল না কেন, ভোটের মুখে উঠছে সেই প্রশ্নও। এর পিছনে রাজনীতির গন্ধ রয়েছে বলেও মনে করছেন বাসিন্দাদের একাংশ। এর সঙ্গে রয়েছে আশপাশের খালের সংস্কার না হওয়া এবং জবরদখলের মতো সমস্যাও। ১৪ নম্বর বরোর চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পরে এই বরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় অবশ্য এলাকার একাংশে জমা জলের সমস্যার অভিযোগ মানতে চাননি। তাঁর কথায়, ‘‘এই বরোর ১২৭ ও ১২৮ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু অংশে জল জমে বটে, তবে ইতিমধ্যেই সমস্যা মেটাতে মাস্টার প্ল্যান ছকা হয়েছে। খাল সংস্কারের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। এই কাজ শেষ হলেই সমস্যা মিটে যাবে।’’

পাঁচ বছর অন্তর পুরবোর্ড গঠন হয়। কিন্তু এলাকার নিকাশির সমস্যার সমাধানে সত্যিই কি কেউ কোনও দিন উদ্যোগী হয়েছেন? আর একটি পুরভোটের আগে এই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন ১৪ নম্বর বরোর বাসিন্দারা। ভোটের আগে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতির ভরসাতেই দিন বদলের আশায় দিন গুনছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

Advertisement