ভোটের ফল প্রকাশের পরে যখন উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা গোটা শহর, তখন হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারের বাইরে চিকিৎসা পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষায় পড়ে থাকতে হল ভোটের দিন বোমায় জখম যুবককে!
অভিযোগ, মঙ্গলবার দিনভর ঘুরে কোনওমতে ট্রলি জোগাড় করে অপারেশন থিয়েটার পর্যন্ত গেলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘স্বাস্থ্যসাথী কার্ড না থাকলে কিছুই করা যাবে না। হয় কার্ড করে আনুন, না হলে ড্রেসিং করেই ছেড়ে দেওয়া হবে।’’ কিন্তু জখম যুবকের প্রশ্ন ছিল, এই মুহূর্তে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড করা যাবে কোথায়? ফেলে রাখলে পা-টাই কেটে বাদ দিতে হবে না তো? আতঙ্কিত পরিবার শেষে হাসপাতালের সুপারের কাছে গিয়ে আশ্বাস পেয়েছিলেন, ‘‘কার্ড না থাকলেও অস্ত্রোপচার হবে।’’
তবে এন আর এস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সুপার ইন্দিরা দে-র বেলা ১২টার এই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয় রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ। তার আগে অপারেশন থিয়েটারের বাইরেই পড়ে থাকতে হয় দীপু দাস নামে ওই রোগীকে। তখন দীপু বলেন, ‘‘আমার তো কোনও দোষ ছিল না। ভোটের দিন রাস্তা পার হচ্ছিলাম, বোমা মারল। এ সব তো প্রশাসনের আটকানোর কথা।’’ রাতে অস্ত্রোপচারের পরে তাঁর আকুতি, ‘‘আপাতত চিকিৎসকেরা কিছুটা করে দিলেও বলেছেন, পরে ফের অস্ত্রোপচার হবে। এখন নিশ্চয়ই সকলে ভোটে জেতার আনন্দ করছেন। কিন্তু দিনভর আমার সঙ্গে যা হল, তা নিয়ে কার কাছে যাব?’’
এ দিন শহর ঘুরে দেখা গেল, ভোটের দিন যে যে এলাকায় গন্ডগোল হয়েছিল, তার বেশির ভাগ জায়গাতেই উৎসব চলছে। দেখে বোঝার উপায় নেই, কোথায় বোমা পড়েছিল, কোথায়ই বা গোলমালে রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল এলাকা। দেখা গেল, টাকি বয়েজ় স্কুলের সামনে এ জে সি বসু রোডের একাংশ সবুজ আবিরে ঢাকা। ওই রাস্তাতেই ভোটের দিন দু’টি বোমা পড়েছিল। জখম হন দীপু ছাড়া আরও দু’জন। স্থানীয় ফল বিক্রেতা শহিদ হুসেন বললেন, ‘‘ভোটের রাত থেকেই অনেকে বাড়ি ঢুকতে পারেননি। এর পরে যে কী হবে!’’
উৎসবের চেহারা শিয়ালদহের খন্না স্কুলের কাছেও। ভোটের সকালে ওই স্কুলের বুথের সামনে দু’টি বোমা পড়েছিল। স্কুলটির কাছেই থাকা একটি রেশন দোকানের কর্মীর মন্তব্য, ‘‘এ ভাবে ভোট? সে দিন মারা যেতে পারতাম।’’ ওই ঘটনায় অবশ্য ইমামউদ্দিন আনসারি (৩৩) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
একই রকম নিরুত্তর বাগবাজার স্ট্রিট। ভোটের দিন ওই রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে একদল লোকের খণ্ডযুদ্ধের ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভিডিয়োয় দেখা যাওয়া এক ব্যক্তির বাড়িতে গেলে তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘‘বাড়িতে শুধু মহিলারা রয়েছি। বাকিরা এলাকাছাড়া। দয়া করে নাম লিখে আরও বিপদে ফেলবেন না।’’ বিপদ কাটবে কবে, সেই প্রশ্ন শোনা গেল আহত দীপুর মেয়ে পূর্ণিমার গলাতেও। দ্বাদশ শ্রেণির ওই পড়ুয়া বলে, ‘‘আমরা তো কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত নই। তা হলে আমাদের সঙ্গে এমন করা হল কেন?’’