Advertisement
E-Paper

চলচ্চিত্রটা বদলালেও চালচিত্রটা প্রায় একই আছে

একটু ভেবে বলুন তো! হাল্কা শীতের রবিবারের সকাল। গরম ছোট কচুরি আর আরও ছোট করে কাটা আলুর দম। খাওয়ার পাত্র প্লেট, ঠোঙা নয় বরং সরু কঞ্চি আর পাতার তৈরি ‘চ্যাঙারি’। তার পরে চা।

কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:২৮

একটু ভেবে বলুন তো! হাল্কা শীতের রবিবারের সকাল। গরম ছোট কচুরি আর আরও ছোট করে কাটা আলুর দম। খাওয়ার পাত্র প্লেট, ঠোঙা নয় বরং সরু কঞ্চি আর পাতার তৈরি ‘চ্যাঙারি’। তার পরে চা। কাগজের কাপ বা হতভাগ্য প্লাস্টিকে নয়, মাটির ভাঁড়ে। গর্ব জিনিসটা ভাল নয়, কিন্তু পাড়া-বোধটার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা এমন কতগুলো জিনিস নিয়ে সামান্য গর্ববোধ না থাকলে স্বকীয়তা ও ‘পরিচিতি’ সম্পূর্ণতা পায় না। আজন্ম যে পাড়ায় আছি, ছেলেবেলায় তা নিয়ে যে গর্ববোধ ছিল, এখনও তাই আছে।

এককালীন উত্তর কলকাতা, কিন্তু শহরের বহর যে হারে বেড়েছে তাতে আমার পাড়া মধ্য কলকাতার ‘উত্তরা়ঞ্চল’। আমার পাড়া মানিকতলা বাজার থেকে শুরু হওয়া অভেদানন্দ রোড (বিডন স্ট্রিট), গোয়াবাগান-হরিতকী বাগান চিরে ডাফ স্ট্রিট, হেদুয়া পার্ক হয়ে, আরও দূর গিয়েছে। ইতিহাসের কত সাক্ষী রয়েছে এই রাস্তার আশপাশে! মিনার্ভা থিয়েটার, কলকাতার প্রথম নার্সিংহোম, বহু যাত্রা দলের আপিস, রবীন্দ্রকানন, যেখানে বৈশাখ মাসের অনুষ্ঠানের টিকিট নিয়ে ঝগড়া হত বাড়িতে। বিডন স্ট্রিট ধরে যাওয়া যায় গঙ্গা অবধি। গঙ্গা বলতেই স্নান, বিসর্জন আবার নিমতলা ঘাট। কলকাতা শহরে যদি কোনও ‘মহাপ্রস্থানের পথ’-এর তালিকা তৈরি হয়, এ রাস্তা তাতে থাকবেই। আজকাল খই ছড়ানো খুব একটা চোখে পড়ে না। তার উপরে অটোয় ‘সুখ স্বপনে আর শান্তি শ্মশানে’ গোছের লেখা পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে যাবেন! তিন চাকার এই যান কলকাতায় এসেছিল দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর পরে। মাত্রাতিরিক্ত অটোর যানজট এ পাড়া দেখছে বহু বছর ধরে।

তার উপরে আছে তেরো পার্বণের মিছিল ও বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের শোভাযাত্রা। ছোটবেলায় দেখেছি, পরেশনাথই হোক বা আমহার্স্ট স্ট্রিটের কোনও ‘হেভিওয়েট’ কালীপুজোর বিসর্জন, বহু মানুষ ভিড় করতেন এগুলি দেখতে। তাসাপার্টি সত্ত্বেও সেই শব্দদূষণ সহনযোগ্য ছিল। বিকট আওয়াজের ‘টেকনোলজি’ আসে আশির দশকে। আর এখন পেল্লায় বাক্স বসানো লরি চলে সব ঠাকুরের আগে, পাড়া রীতিমতো কাঁপে! কালীপটকা আর চকোলেট বোমা কমেছে ঠিকই কিন্তু উৎসবের মরসুমে কানে তালা লেগে যাওয়াটা এ পাড়ার মানুষের ভবিতব্য। এত পুজো কি সত্যি দরকার! তবে ছেলেবেলা থেকেই দেখেছি আমাদের পাড়া একটু বেশি সবুজ, গাছগুলো এখনও আছে।

শব্দদূষণ বাড়লেও তাই দৃশ্যদূষণ খুব একটা বাড়েনি তবে সেটাও ‘পুজো-পার্বণ’ বাদ দিয়ে। বিসর্জনের মিছিলে রাস্তাটা নাইট ক্লাবের ফ্লোর হয়ে যায়! কিশোর-কিশোরীরা নাচ-গান করুক, কিন্তু ইদানীং যে রুচিবোধের নিদর্শন মেলে তাকে বিশ্রী ও কুৎসিত ব্যতীত অন্য কিছু বিশেষণে ভূষিত করা যায় না।

শহরের ভূতল নিকাশির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নাকি আমাদের পাড়ার নীচে। বলা হয়, এখানে জল জমা মানে কলকাতা ভেসে গিয়েছে! নিকাশির উন্নয়নে বিগত বছরগুলিতে রাস্তা ভাঙা হয়েছে বিস্তর, মেরামতিও হয়েছে। গত বছর ফুটপাথও উন্নত হয়েছে। তবুও পুরনো বনেদি কলকাতার অনেক স্থাপত্যের নিদর্শন এখানে পাবেন, খড়খড়ির দরজা, গ্রিলের বদলে লোহার জাফরি ইত্যাদি। গলিতে বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হলেও বড় রাস্তায় খুব একটা হয়নি। অনেক সম্ভ্রান্ত বাঙালি ব্যবসায়ী এখনও এখানে থাকেন, দত্ত পরিবারের একাধিক বাড়ি এখানেই।

ঘনবসতিপূর্ণ পুরনো গলিঘুঁজির পাড়া, মোটের উপর মধ্যবিত্ত। বাবলুদার টেলারিং, দু’একটা স্টেশনারি ইত্যাদি ছাড়া দোকানপাট কম। কিন্তু ডাইনে-বাঁয়ে শয়েক গজ গেলেই দোকানের ছড়াছড়ি। বসন্ত কেবিন এখনও আছে। আমাদের শপিং মল নেই কিন্তু পা বাড়ালেই মানিকতলা বাজার, যা মৎস্যপ্রিয় বাঙালির পীঠস্থান। বরাবরই এটা পড়াশোনার পাড়া। মারিয়া মন্তেসারি কলকাতায় এসেছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু আমাদের হাতেখড়ির স্কুল ছিল ‘শিশু নিকেতন’। স্কটিশ চার্চ, হোলি চাইল্ড, মুকুল বীথি, সেন্ট মার্গারেট, ভবতারণ বিদ্যালয়, বেথুন কলেজ ও একাধিক হোস্টেল—সবই আছে। এ পাড়ায় ইতিহাস নিয়ে বই লেখা যায়, সুতানুটির অনেকেই একমত হবেন। রাজনীতির ইতিহাস অতুল্য ঘোষ (পাশের পাড়ায় থাকতেন) থেকে এখনকার ‘কেশব ভবন’— রাজ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান কার্যালয়। আমাদের বাড়িতে বহু দিন আগে থাকতেন ব্যাকরণ বিশারদ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, শ্রীরামকৃষ্ণেরও পদধূলি পড়েছিল এ বাড়িতে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক স্থান আছে আশপাশে— গোয়াবাগানের চণ্ডীবাড়ি, আনন্দ আশ্রম। ক্রীড়া, শিক্ষা— সবই পাবেন। কুস্তিগীর গোবর গোহর আখড়া, আরতি সাহা ও তাঁর বিখ্যাত সাঁতারু পরিবার, আইনজ্ঞ শম্ভু ঘোষ (হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন) চিকিৎসক পঞ্চানন চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

বর্তমানেও উচ্চশিক্ষার ঘাটতি নেই কিন্তু অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন কর্মসূত্রে। ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’-এর নির্মাতা অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় এখানকার বাসিন্দা। এই ছবির কিছু অংশের শ্যুটিংও হয়েছিল এ পাড়াতেই।

প্রচার সর্বস্ব দুনিয়ার সঙ্গে এ পাড়া মানানসই নয়, সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন খুব একটা হয়নি ঠিকই, আমরা ‘সাটিন’ ছিলাম না, কিন্তু ভাল মানের ‘ধুতি’ ছিলাম। চলচ্চিত্রটা বদলালেও চালচিত্রটা প্রায় একই আছে।

লেখক বিশিষ্ট চিকিৎসক

ছবি: শুভাশিস ভট্টাচার্য।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy