Advertisement
E-Paper

ছেলে যে মৃত, মাঝেমধ্যে ভুলে যাচ্ছেন বৃদ্ধা মা

গত শুক্রবার বরাহনগরের শশিভূষণ নিয়োগী গার্ডেন লেনে গৌরীদেবীর বাড়ি থেকে কটু গন্ধ পেয়ে সন্দেহ হয় প্রতিবেশীদের।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০১৯ ০১:১৯
 অসহায়: বরাহনগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে গৌরী ঘোষ। সোমবার। —নিজস্ব চিত্র।

অসহায়: বরাহনগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে গৌরী ঘোষ। সোমবার। —নিজস্ব চিত্র।

একাত্তর বছরের বৃদ্ধা জানেন, তাঁর ছেলে মারা গিয়েছেন। তা-ও হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে মাঝেমধ্যেই একমাত্র ছেলে পার্থসারথির খোঁজ করে কেঁদে উঠছেন মা গৌরী ঘোষ।

গত শুক্রবার বরাহনগরের শশিভূষণ নিয়োগী গার্ডেন লেনে গৌরীদেবীর বাড়ি থেকে কটু গন্ধ পেয়ে সন্দেহ হয় প্রতিবেশীদের। খবর পেয়ে পুলিশ এসে দরজা ভাঙলে দেখা যায়, খাটে চিৎ হয়ে পড়ে আছে পার্থসারথির পচাগলা দেহ। পাশে মেঝেতে মুখ গুঁজে পড়ে গৌরীদেবী। তিনিই সে সময়ে প্রতিবেশীদের জানিয়েছিলেন, চার দিন আগে ছেলের মৃত্যু হয়েছে। ঘরের ভিতর থেকে সকলকে ডাকলেও কেউ শুনতে পাননি।

হাঁটাচলা করতে অক্ষম, অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগা ওই বৃদ্ধাকে সে দিনই বরাহনগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন পড়শিরা। সেই থেকে আপাতত হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডেই রয়েছেন গৌরীদেবী। তাঁর শয্যার পাশেই রয়েছে বড় একটি জানলা। প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে কিছুক্ষণ উদাস ভাবে খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে থাকেন বৃদ্ধা। হাসপাতালের নার্স ও আয়াদের কথায়, ‘‘জানলার দিকে তাকিয়ে থাকেন, আর দু’চোখ দিয়ে জল পড়ে। চোখ মুছিয়ে দিতে গেলে মাঝেমধ্যে ছেলের নাম করে জানতে চান, তিনি কোথায় আছেন?’’ যা দেখে চিকিৎসকেরা মনে করছেন, ওই বৃদ্ধার স্মৃতিভ্রম হচ্ছে।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

বরাহনগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালের সুপার জয়ব্রতী মুখোপাধ্যায় জানান, গৌরীদেবীর সব রকমের পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে পক্ষাঘাত নয়, তবে বৃদ্ধার হাড়ে ভাল রকমের সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সন্ধিস্থল ক্ষয়ে যাওয়ায় বৃদ্ধার শরীরও বেঁকে গিয়েছে। সেই কারণেই তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্টিজনিত রোগেও ভুগছেন তিনি। এই সব সমস্যা কাটাতে বৃদ্ধাকে প্রতিদিন ভাত, ডাল, মাছ খেতে দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে দু’বেলা দেওয়া হচ্ছে হরলিক্সও।

জয়ব্রতীদেবী বলেন, ‘‘মেডিসিন ও হাড়ের চিকিৎসক ওঁকে দেখছেন। অপুষ্টি দূর করতে মাল্টি-ভিটামিন ইঞ্জেকশন দেওয়া হচ্ছে। তবে বৃদ্ধার পার্কিনসন্সেরও সমস্যা রয়েছে। তাই পরে ওঁকে স্নায়ু ও রিউম্যাটোলজির চিকিৎসক দেখানোর জন্য বলব আত্মীয়দের।’’ তবে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এখনও অন্তত আরও আট-দশ দিন গৌরীদেবীকে হাসপাতালে থাকতে হবে। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই বাড়ি যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি জুড়ে দিচ্ছেন বৃদ্ধা। হাতে স্যালাইনের নল গোঁজা অবস্থাতেই মাঝেমধ্যে চেপে ধরছেন আয়া, নার্সদের পোশাক। কখনও ডাক্তারদের হাত ধরে কেঁদে বলছেন, ‘আমাকে বাড়ি দিয়ে এসো।’

কিন্তু বাড়িতে কে দেখভাল করবে তাঁর? প্রশ্ন করলেই কিছু ক্ষণ চুপ থেকে বৃদ্ধা জানাচ্ছেন, ‘‘আমার তিন বোন আছে। তাঁরা আয়া রেখে আমার দেখভাল করবে।’’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, গত শনিবার গৌরীদেবীর বৌমা রূপা ঘোষ এক বার তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। তবে প্রতিদিনই বৃদ্ধার এক বোন ও তাঁর স্বামী খোঁজখবর নিতে আসেন বলে জানাচ্ছেন হাসপাতালের কর্মীরা।

আর প্রতি রাতে বৃদ্ধা ওয়ার্ডে কর্মরত সকলকে বলছেন একটাই কথা। ‘‘জানো, ছেলে মারা যাওয়ার সময়ে আমার হাত ধরে বলেছিল, মা তোমাকে দেখার তো কেউ নেই। তুমি আমার সাথে চল। আমার হাত ধরে থাকো’’—কথা বলতে বলতে দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে গৌরীদেবীর।

Partha Sarathi Ghosh Death
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy