শরীরের আর কোথায় ক্যানসার ছড়িয়েছে, তা জানতে পেট সিটি স্ক্যানের অপেক্ষায় রোগীকে থাকতে হচ্ছে প্রায় চার মাস! এ দিকে, রোগ ছড়ানোর বিস্তারিত তথ্য না পেয়ে রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসার চেষ্টাও হাতছাড়া হচ্ছে। নীরবে বাড়ছে ক্যানসারে মৃতের সংখ্যা। এমনই পরিস্থিতি রাজ্যের একমাত্র সরকারি পেট সিটি যন্ত্রের ভার টেনে চলা নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের।
গোটা রাজ্যে শুধুমাত্র এই সরকারি হাসপাতালেই পেট সিটি স্ক্যানের ব্যবস্থা আছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে কয়েকটি জায়গায় ওই পরীক্ষা হলেও তার খরচ ২২ হাজার টাকার আশপাশে। শহরের প্রথম সারির সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক বিভাগীয় প্রধান বললেন, ‘‘সরকারি পরিকাঠামোয় যাঁরা চিকিৎসা করাতে আসেন, তাঁদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত। তাঁদের পক্ষে ওই খরচ টানা সম্ভব নয়। ফলে রোগীর চিকিৎসার শেষ চেষ্টা হাতছাড়া হচ্ছে। এ দিকে, করোনার জন্য চিকিৎসার অভাবে বেড়েছে ক্যানসার রোগীও।’’
দু’টি ফুসফুসেরই সমস্যা নিয়ে মোকসাদ আলি গাজ়ি নামে এক রোগী ভর্তি হয়েছিলেন শহরের একটি সরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা সন্দেহ করেন, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত। নিশ্চিত হতে টিসুর নমুনা সংগ্রহ করে এফএনএসি (ফাইন নিডল অ্যাস্পিরেশন সাইটোলজি) পরীক্ষা করা হয়। রিপোর্ট আসে অ্যাডিনোকার্সিনোমায় আক্রান্ত গাজ়ি। চিকিৎসকদের বক্তব্য, গাজ়ির শরীরে আর কোথায় ক্যানসার থাবা বসিয়েছে, তা জানার একমাত্র উপায় পেট সিটি স্ক্যান। যার তারিখ এনআরএস দিয়েছে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে।
শহরের অন্য একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি মালঞ্চের বাসিন্দা বিনয় ভুঁইয়া। তাঁর ফুসফুসে একটি টিউমার শ্বাসনালি ও
খাদ্যনালিকে চেপে দিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পরে বায়োপ্সি এবং এফএনএসি করে জানা যায়, ক্যানসারটি আগ্রাসী চরিত্রের। রাস্তার ধারে চা বিক্রি করেন বিনয়। চিকিৎসকদের কথা মতো পেট সিটি-র তারিখ আনতে এনআরএসে গিয়েছিলেন নভেম্বরের শেষে। তারিখ পেয়েছেন ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। বিনয়ের চিকিৎসক বলেন, ‘‘হয়তো উনি তত দিন বাঁচবেন না। রোগ আর কোথায় ছড়িয়েছে, জেনে রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপি দিলে আরও কিছুটা সময় হয়তো ওঁকে দেওয়া যেত।’’
প্রায় আড়াই কোটি টাকার এই যন্ত্রের মতোই প্রয়োজনীয় স্ক্যানের মূল উপাদান ডাই। সরকারি পরিকাঠামোয় এই যন্ত্র বসাতে এবং স্বল্পমেয়াদি ডাই (যেটি তৈরির পরে প্রয়োগ পর্যন্ত প্রায় দু’ঘণ্টা মেয়াদ) প্রয়োগ পর্যন্ত পর্বটি বেশ জটিল বলেই জানাচ্ছেন স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা। সরকারি পরিকাঠামোয় এই যন্ত্রের ব্যবহার কম হওয়ার অন্যতম কারণ সেটাও।
কী এই পেট সিটি স্ক্যান? চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, গ্লুকোজ়ের সঙ্গে আইসোটোপ মিশিয়ে তৈরি হয় ডাই। যা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে ঢোকানো হয়। এর কিছু পরে পেট সিটি যন্ত্রে শুইয়ে ছবি তোলা হয় শরীরের। ক্যানসারের কোষের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। তাদের খিদেও বেশি। খাবার হিসাবে গ্লুকোজ় পেলে কোষগুলি তা টেনে নেয়। সঙ্গে যায় আইসোটোপগুলিও। স্ক্যানে বিভিন্ন কোষে সেই আইসোটোপের উপস্থিতি দেখেই বোঝা যায়, ক্যানসার কোথায় কোথায় ছড়িয়েছে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, মূলত গ্লুকোজ়ের সঙ্গে ফ্লুয়োরিনের আইসোটোপ মিশিয়ে এই ডাই তৈরি হয়। তবে মস্তিষ্ক যে হেতু সর্বদা সক্রিয়, তাই সেখানের ক্যানসার ধরার ক্ষেত্রে ফ্লুয়োরিন নয়, ফাঁদ হিসাবে কার্যকর কার্বন মিথিয়োনিন আইসোটোপ।
ক্যানসার চিকিৎসক সায়ন পাল বলছেন, ‘‘ডাই তৈরির পরে কয়েক ঘণ্টায় সেটি ব্যবহার করে নিতে হয়। ফলে রোগীর সঙ্গে পেট সিটি বিভাগের ভাল যোগাযোগ থাকাটা খুব জরুরি। আইসোটোপ ইঞ্জেকশন নেওয়া রোগীকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসানো যায় না। ফুসফুস, লিম্ফোমা, স্তন, কোলন, জরায়ুমুখ, ডিম্বাশয় ও মেটাস্টেটিক ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা জরুরি।’’
এনআরএস হাসপাতাল সূত্রের খবর, সেখানে ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার তারিখ মিলছে প্রায় ২০-২৫ দিনের পরে। আর বহির্বিভাগের রোগীর ক্ষেত্রে তারিখ পেতে দু’মাস লাগছে। অন্য হাসপাতালের রোগীর ক্ষেত্রে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ।
ভবিষ্যতে এই অপেক্ষার সময় কমার সামান্য আশ্বাস মিলছে। রাজ্যের স্বাস্থ্য-অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘শুধু বিপুল খরচই নয়, সরকারি পরিকাঠামোয় এই যন্ত্র বসানোর আনুষঙ্গিক সমস্যা আছে। তবে চেষ্টা চলছে এসএসকেএমে আগামী বছরেই যাতে পেট সিটি স্ক্যানের পরিষেবা শুরু করা যায়। আপাতত অন্যত্র এই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।’’