E-Paper

শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুরমুশ প্রেসিডেন্সির চার কন‍্যার

প্রেসিডেন্সির আজকের শিক্ষার্থী-দলের চার জনই ষষ্ঠ সিমেস্টারের। ডিবেটিং সোসাইটির তাঁরা পদাধিকারী। জীববিজ্ঞানের পড়ুয়া দেবশ্রুতি বন্দ্যোপাধ্যায় শুরুতেই নতুন শিক্ষানীতির স্নাতক স্তরে সময়ের মেয়াদে বাঁধা গবেষণাকে নিশানা করেন।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৪৪
প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি।

প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি। —ফাইল চিত্র।

‘আজকের প্রথাগত শিক্ষা জ্ঞানচর্চার কণ্ঠরোধ করছে’ বলে মেনে নিয়ে বিতর্কে শামিল হয়েছিল প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি। বিতর্কে চৌকস, সাবেক প্রেসিডেন্সি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কৃতী প্রাক্তনী (১৯৬৬-৬৯) উদয়ন মুখোপাধ‍্যায় স্মারক বিতর্কে সভার মতের পক্ষে সওয়াল করছিলেন বিশ্ববিদ‍্যালয়ের চার ছাত্রী। তাঁদের বিরুদ্ধে চার বিশিষ্ট প্রাক্তনী— বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ‍্যাপক জ়াদ মাহমুদ, প্রাক্তন বিচারপতি সুব্রত তালুকদার, সাংবাদিক ও ক‍্যালকাটা ডিবেটিং সার্কলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদীপ গুপ্তু এবং দেশের প্রাক্তন সংস্কৃতি সচিব ও সাংসদ জহর সরকার।

প্রেসিডেন্সির আজকের শিক্ষার্থী-দলের চার জনই ষষ্ঠ সিমেস্টারের। ডিবেটিং সোসাইটির তাঁরা পদাধিকারী। জীববিজ্ঞানের পড়ুয়া দেবশ্রুতি বন্দ্যোপাধ্যায় শুরুতেই নতুন শিক্ষানীতির স্নাতক স্তরে সময়ের মেয়াদে বাঁধা গবেষণাকে নিশানা করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সমৃদ্ধা নন্দী ঝড়ের বেগে বললেন, “শিক্ষা ব‍্যবস্থা তো সরকারি বা হিন্দুত্বের প্রচার-যন্ত্র হয়ে গিয়েছে। মতাদর্শের, এমনকি গবেষণার কাজে স্বাধীনতা কই? শিক্ষকেরাও এর শিকার!” পর পর অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ‍্যাপক সব‍্যসাচী দাস, এস ইরফান হাবিব, জিএন সাইবাবা প্রমুখের উপরে পীড়নের নমুনা তুলে ধরলেন তিনি। ইংরেজির মেঘমা মুখোপাধ‍্যায়ের মতেও, ‘‘এই শিক্ষা ব‍্যবস্থা আদতে এলিটতন্ত্র। কিছু কুলীন প্রতিষ্ঠানের দাপটে ভরপুর।”

ঝড়ের মুখে জ়াদ মাহমুদ বোঝাচ্ছিলেন, কবিতা লেখা বা জ‍্যাজ় গানবাজনা যা-ই করো, নতুন সৃষ্টি করতে গেলেও একটা কাঠামো লাগে। সেটা মোটেই ছাঁচে ঢালা নয়! বিচারপতি তালুকদার পড়ুয়াদের বললেন, কালিদাসের মতো যে ডালে বসেছ, সেটা কাটতে যাওয়া ভাল নয়। বিতর্কের সঞ্চালক, হাড়ের ডাক্তারবাবু কৌশিক ঘোষের মতেও, শিক্ষা ব‍্যবস্থা একটা মাচার মতো ভিত্তিভূমি। তবে জ্ঞানের পণ‍্যায়ন নিয়ে তিনিও দুঃখ করলেন।

বিস্ফোরক নবীন ব্রিগেডের সামনে লড়াইয়ের গতি ইচ্ছে করেই ঢিমেতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন জহর সরকার এবং প্রদীপ গুপ্তু। প্রদীপ বললেন, “আমরা তো ডাইনোসর। অতীতে শিক্ষা ব‍্যবস্থায় গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্রও তৈরি হয়েছেন। কিন্তু নতুন যুগের শিক্ষার চাহিদা নবীনদের বুঝতে হবে।” তাঁর কথায়, “শিক্ষা ব‍্যবস্থা পঠনপাঠনের অভ‍্যাস তৈরি করে। এ আদতে আলো তৈরির কারখানা।”

প্রেসিডেন্সির স্থান মাহাত্ম‍্যের কথা পাড়লেন জহর। রামমোহনের মতো বাঙালিরা প্রথাগত শিক্ষার আর্জিতে সরব হওয়ার পরে এখানেই ব্রিটিশ আমলে প্রথম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সহাস্যে প্রেসিডেন্সির পোর্টিকো থেকেও শিক্ষা লাভের কথা বললেন তিনি। জহরের কথায়, “প্রথাগত শিক্ষা না-থাকলে কিন্তু ইতিহাস থেকে মোগল বা গুজরাতের হিংসা লোপাট হতে পারে! গণেশের প্লাস্টিক সার্জারি নিয়েই তখন চর্চা হবে।’’

শেষ কথা বলতে উঠে ইতিহাসের ছাত্রী সম্পূর্ণা সান‍্যাল দৃপ্ত স্বরে বললেন, “বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা আমাদের হাতে নেই বলে চলতি ব‍্যবস্থার ফাঁক অস্বীকার করা যায় না। এত শিক্ষাছুট, এত জনের মানসিক চাপ, আত্মহনন কি ভোলা যায়?” মগজধোলাই তন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ ঘোষণায় সভার ভোটাভুটিতে নবীনদের জয়ই ছিনিয়ে আনল। তবে তিন বিচারক, আইনজীবী সায়ক চক্রবর্তী এবং উদ্যোগব্রতী ঊর্মি চক্রবর্তী, শঙ্কর রামালিঙ্গম প্রাক্তনীদেরই জিতিয়েছেন। প্রয়াত প্রাক্তনী উদয়নের সতীর্থ, পদার্থবিদ্যার পার্থসারথি সেনগুপ্তও এসেছিলেন। তর্কশীল প্রেসিডেন্সির প্রাণচাঞ্চল্যই শেষ কথা বলে গেল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Presidency University debate Education system

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy