E-Paper

বাজি ক্লাস্টার ‘অন্ধকারে’ই, মারণ ব্যবসা থামবে কি

রাজ্যে পালাবদলের পরে এ বার কি বন্ধ করা যাবে বেআইনি বাজির কারবার? একাধিক ক্ষেত্রে নতুন সরকারের পদক্ষেপ দেখে এই নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে বাজি মহল্লার বাসিন্দাদের মধ্যে।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ০৮:৩৬

—প্রতীকী চিত্র।

এক দিকে বাজি নিয়ে সরকারি প্রকল্প ঘোষণা হয়েছে, দফায় দফায় বাজির ক্লাস্টার তৈরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, বাজি বিস্ফোরণে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে অহরহ। কোথাও বেআইনি বাজি তৈরি করতে গিয়ে একসঙ্গে ১০ জন ঝলসে গিয়েছেন। কোথাও বাজি তৈরির জন্য মজুত করা বারুদ বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছে প্রায় গোটা পাড়া। ন’জনের ক্ষতবিক্ষত দেহ বিভিন্ন দিকে ছিটকে পড়েছে। রক্ষা পায়নি বেআইনি বাজি কারখানার বাইরে খেলতে থাকা স্কুলপড়ুয়াও। তার মৃত্যুর পরে মেয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট নিতে যাওয়া মা বলেছেন, ‘‘যার যায়, তার যায়। কই, বাচ্চাদের মৃত্যুর পরেও তো কিছুই বদলায়নি!’’ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘‘যতটা গর্জানো হয়েছে, বর্ষানো হয়নি ততটা। বাজি কারবারিরা জামিনে বেরিয়ে ফের সেই মারণ ব্যবসা শুরু করেছেন।’’

রাজ্যে পালাবদলের পরে এ বার কি বন্ধ করা যাবে বেআইনি বাজির কারবার? একাধিক ক্ষেত্রে নতুন সরকারের পদক্ষেপ দেখে এই নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে বাজি মহল্লার বাসিন্দাদের মধ্যে। মহেশতলার নুঙ্গি, চম্পাহাটি, বারাসতের নারায়ণপুরের মতো একাধিক এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, গত কয়েক বছরে ঘিঞ্জি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে যত জনের মৃত্যু হয়েছে, বাজি বিস্ফোরণে মৃতের সংখ্যা তার চেয়ে খুব কম নয়। ফি-বছর রাজ্যে বাজি বিস্ফোরণে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জনের মৃত্যুর খবর রয়েছে পুলিশের কাছেও। তবু কেন আগে পদক্ষেপ করা হয়নি, সেই প্রশ্ন উঠছে।

পর পর মৃত্যুর ঘটনায় পূর্বতন তৃণমূল সরকার বাজির ক্লাস্টার তৈরির কথা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ঘোষণার পর থেকে চার বছর কেটে গেলেও ক্লাস্টার দিনের আলো দেখেনি। ক্লাস্টারের জন্য জমি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি চলছে বলে অভিযোগ ওঠে। ক্লাস্টারে যাঁরা দোকান করবেন, তাঁদের থেকে টাকা তোলা হয়েছে বলেও অভিযোগ। সরকার বদলের পরে সেই টাকা ফেরত চেয়ে পুলিশেও অভিযোগ জমা পড়ছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ক্লাস্টারের পাশাপাশি সরকার ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) দফতরের অধীনে সবুজ বাজি তৈরি, মজুত এবং বিক্রি সংক্রান্ত একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছিল। তার নাম দেওয়া হয় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল গ্রিন ফায়ারক্র্যাকার ম্যানুফ্যাকচারিং, স্টোরেজ অ্যান্ড সেলিং স্কিম’ (ডব্লিউবিজিএফএমএসএস)।

ঠিক হয়, এই প্রকল্পে সবুজ বাজির ক্লাস্টার তৈরির জন্য সরকারি জমি চিহ্নিত করবে এমএসএমই দফতর। ৩০ বছরের জন্য লিজ়ে সেই জমি নেওয়ার কাজে সাহায্য করবেন জেলা প্রশাসকেরা। যে সব ব্যবসায়ী নিজেদের কেনা জমিতে ক্লাস্টার তৈরি করার কাজ করবেন, তাঁদের মোট খরচের ৯০ শতাংশ সরকারের তরফে তিন কিস্তিতে দেওয়া হবে। পাশাপাশি, এই রাজ্যের সব বাজি প্রস্তুতকারকের জন্য ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (নিরি)-এর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করবে সরকার। গোটা প্রকল্পের কাজে নজরদারির জন্য জেলা এবং রাজ্য স্তরে দু’টি কমিটি তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, সবই থেকে গিয়েছে শুধু ঘোষণার পর্যায়ে।

এ সবের মধ্যেই বাজি বিস্ফোরণে ১৬ বছরের মেয়েকে হারানো কৃষ্ণা দাস বললেন, ‘‘দিনের পর দিন দেখেছি, পুলিশ বাজির কারবারিদের ধরে না। ধরলেও এমন মামলা হয়, যাতে তাঁরা জামিন পেয়ে যান। আদালতে পুলিশ জানায়, বাজি তৈরির কোনও সামগ্রীই উদ্ধার করতে পারা যায়নি। যে হেতু বাজেয়াপ্ত করার কিছু নেই আর হেফাজতে নিয়ে তদন্তের আর্জিও জানানো হয় না, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেআইনি বাজির ব্যবসায়ীদের জামিন হয়ে যায়। এ বার এই পরিবেশ পাল্টাক। আমার মেয়ের মতো ভয়াবহ পরিণতি আর কারও যেন না হয়।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Fire Crackers Crackers

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy