E-Paper

পুলিশের আদরে ট্র্যাফিক চৌকিতে বাড়ছে ‘ডিঙ্গো’

পার্ক সার্কাস মোড়ে ট্র্যাফিক চৌকিতে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের আদরে এ ভাবেই বড় হচ্ছে চার মাসের পথকুকুর ‘ডিঙ্গো’।

চন্দন বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ০৯:১১

বাদামি রঙা গায়ে শুধু মুখের কাছে কালো ছোপ। তার মধ্যে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। ছিপছিপে চেহারায় আর পাঁচটা যে কোনও সারমেয়কে সে হার মানাবে। বেল্ট দিয়ে বাঁধা সে আপাত শান্ত হয়ে বসে থাকলেও, সাদা পোশাকের পরিচিত পুলিশকর্মীদের এগিয়ে আসতে দেখলেই আর তাকে পায় কে! লাফালাফিশুরু করে কখনও কোলে ওঠার চেষ্টা করছে, আবার কখনও সামনের দু’পা দিয়ে উর্দিধারীকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে। কিছু ক্ষণ এ ভাবে চলার পরে মাথায় খানিক হাত বুলিয়ে দিলেই হল। চুপটি করে সে বসেপড়বে বিশ্রাম নিতে আসা পুলিশকর্মীর গা ঘেঁষে।

পার্ক সার্কাস মোড়ে ট্র্যাফিক চৌকিতে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের আদরে এ ভাবেই বড় হচ্ছে চার মাসের পথকুকুর ‘ডিঙ্গো’। তিনবেলা খাবার, জল থেকে শুরু করে নিয়ম করে স্নান— সবই চলছে পুলিশের তত্ত্বাবধানে। রাস্তার কর্তব্যের ফাঁকে চৌকিতে এসে পুলিশকর্মীদের কেউ তাকে বিস্কুট খাইয়ে দিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আবার বাইকে এলাকায় চক্কর কাটার ফাঁকে নিছক আদর করতেই ঘুরে যাচ্ছেন তার কাছে। সকলে মিলে আদর করে পোষ্যের নাম রেখেছেন ডিঙ্গো।

পার্ক সার্কাস মোড় কলকাতা পুলিশের ইস্ট ট্র্যাফিক গার্ডের অন্তর্গত। সেই গার্ডের কর্মীদের একাংশই আপাতত ডিঙ্গোর অভিভাবক। এই ট্র্যাফিক গার্ডের কর্মীদের একাংশে সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাসচারেক আগে ডিঙ্গোকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখতে পেয়েছিলেন এক পুলিশকর্মী। ঠিকমতো না খেতে পেয়ে হাঁটাচলার শক্তিটুকুও ছিল না কুকুরছানাটির। তখন ওই ট্র্যাফিক গার্ডের সার্জেন্ট স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায়-সহ আরও কয়েকজন উদ্যোগী হন। রাস্তায় থাকা কুকুরছানাটির ঠাঁই হয় চৌকিতে। সেই থেকে পুলিশের সঙ্গী ডিঙ্গো। ট্র্যাফিক সার্জেন্ট স্নেহাশিসের কথায়, ‘‘ওকে যখন আমরা নিয়ে আসি তখন ওর এমন চেহারা ছিল যে, হাতের মুঠোয় ওর গোটা শরীরটা ঢুকে যেত। ঠিক মতো তাকাতেও পারত না। সেই ছোট্ট থেকে কত কষ্ট করে যে ওকে বড় করা!’’

জানা গেল, শুরুর দিকে কিছুই খেতে পারত না ডিঙ্গো। পুলিশকর্মীরাই দুধের ব্যবস্থা করেছিলেন। নিয়ম করে পাশের চায়ের দোকান থেকে দুধ আসত ডিঙ্গোর জন্য। রাস্তায় যাতে কোনও ভাবে চলে গিয়ে গাড়ির তলায় না পড়ে, সে জন্য চৌকিতেই ডিঙ্গোর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সেই ব্যবস্থাই থেকে গিয়েছে। যদিও আপাতত সুস্থ ডিঙ্গো বেশ কিছুটা বড় হয়েছে। পশু চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রতিষেধক— ব্যবস্থা হয়েছে করা হচ্ছে সব কিছুরই। ট্র্যাফিক গার্ডের কনস্টেবল থেকে শুরু করে হোম-গার্ড, সকলেই ডিঙ্গোর খেয়াল রাখেন। নিয়ম করে যাঁর যে দিন ডিউটি থাকে, সে দিন তাঁরা এসে খোঁজ নিয়ে যান ডিঙ্গোর।

ডিঙ্গোর দিকে খেয়াল রাখার দলেই রয়েছেন এই ট্র্যাফিক গার্ডে কর্মরত রাকেশ ঘোষ। ট্র্যাফিক সার্জেন্ট রাকেশের কথায়, ‘‘আমাদের যা চাকরি, তাতে সারা দিন তো পথেই কেটে যায়। কত কুকুরকে তো রাস্তায় গাড়ির নীচে পড়ে মরে যেতে দেখেছি। সবাইকে হয়তো বাঁচাতে পারি না। কিন্তু একজনকে তো পেরেছি। এটাই বা কম কী!’’

পুলিশকর্মীরাই জানালেন, ডিঙ্গোর আগে আরও এক পথকুকুরকে উদ্ধার করে এখানে এনে রাখা হয়েছিল। তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হিরণ’। ইস্ট ট্র্যাফিক গার্ডের অফিস এখন তার ঠিকানা। পার্ক সার্কাস মোড়ে ট্র্যাফিক সামলানোর ফাঁকে স্নেহাশিসের ফোনে হিরণের ছবি দেখা গেল। তিনি বললেন, ‘‘বাবু এখন গরমে এসি ঘর ছেড়ে আর বেরোতেই চায় না। ডিঙ্গো আসার আগে পর্যন্ত ও এখানেই থাকত। ডিঙ্গোকে আনার পরে ওকে গার্ডে নিয়ে চলে যাওয়া হয়েছে। কিছুদিন বাদে ডিঙ্গোকেও ওখানে নিয়ে যাব। তখন এখানে হয়তো ডিঙ্গো-হিরণের মতো নতুন একজন এসে আবার বড় হবে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Traffic Police Park circus

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy