মারাদোনার বিশ্বজয়ের অবিস্মরণীয় চলচ্ছবির টানে ভিড় হয়েছিল বইমেলায় আর্জেন্টিনার প্যাভিলিয়নে। কিন্তু বুয়োনোস আইরেসের প্রবীণ সাংবাদিক-লেখক মাতিলদে সানচেস মনে হল, অন্য দৃশ্যপট নিয়ে চিন্তিত। ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর উৎপাটনের ঘটনা মেসি-মারাদোনার দেশের মনেও প্রবল ছাপ রেখেছে। মাতিলদে বলছিলেন, “আমাদের দেশের বোর্হেসের কল্পকাহিনি থেকে শুরু করে নানা আঙ্গিকে প্রযুক্তি-নির্ভর দৃশ্যপ্রপাত পর্যন্ত ফেল করে যাচ্ছে বাস্তবের অদ্ভুত ঘটনার সামনে। এ সব সিনেমা-মার্কা বয়ানের সঙ্গে এঁটে উঠতে বই বা কাগজের প্রতিবেদনও সর্বত্রই মুশকিলে পড়ছে।”
মঙ্গলবার বইমেলার শেষ দিন পর্যন্ত অবশ্য অপ্রত্যাশিত বেয়াড়া দৃশ্যপটকে ঠেকিয়ে রাখতে সফল কর্তৃপক্ষ। একটি ছোট স্টলে কয়েকটি বইয়ে ভিন্ধর্মীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচার নিয়ে অভিযোগ আসে। কর্তৃপক্ষের অনুরোধে স্টলকর্তারা বইগুলি সরিয়ে রাখেন। রিং রোডের ‘বেআইনি’ টুকিটাকি বিক্রেতারাও ন’নম্বর গেটের বাইরে স্থানান্তরিত। মুক্তমঞ্চের প্রতিবাদীরা অদৃশ্য। শেষ দিনেও ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় উত্তমকুমারের প্রদর্শনীতে বায়োস্কোপের কাচে চোখ রাখতে। অনেকেই সুপার-এইট প্রজেক্টরের শো-য়ে মশগুল। সবুজপত্রের স্টলে ১৯৪৭, ’৪৮-এর স্বাধীনতা দিবসের আনন্দবাজার পত্রিকা কিংবা রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর মহাপ্রয়াণের পরের যুগান্তর, আনন্দবাজারও দ্রষ্টব্য ছিল।
৪৯তম বইমেলা সব মিলিয়ে বাঙালির স্মৃতিমেদুরতা উস্কে দেওয়া চেনা দৃশ্যেরই ক্যানভাস। অতিথি দেশ আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিরা খুশি কলকাতায় এসে। অতীতে ইউরোপের অন্য থিম দেশের তুলনায় জাঁকজমক কম। কিন্তু আন্তরিকতা এবং উপস্থাপনার গভীরতা সে-অভাব পুষিয়ে দিয়েছে
আর্জেন্টিনার অঙ্গনে সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস, হুলিয়ো কোর্তাসার বা বিশ শতকের বিখ্যাত আলোকচিত্রী সারা ফাসিয়োর ছবিই চোখ টানছে। বুয়োনোস আইরেসের ভারতীয় দর্শন চর্চা কেন্দ্র হস্তিনাপুর ফাউন্ডেশনের গুস্তাভো কানসোবরে-র বক্তৃতা থেকে আর্জেন্টাইন সংস্কৃতির প্রাণভোমরা তাঙ্গো নাচের কর্মশালা উপভোগ করেছে কলকাতা।
দিল্লির দূতাবাসে আর্জেন্টিনার ডেপুটি চিফ অব মিশন আন্দ্রেস সেবাস্তিয়ান রোখাস বলছিলেন, “মেসি, মারাদোনা বা রবীন্দ্রনাথ-ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সৌহার্দ্যের বাইরে এক অন্য আর্জেন্টিনাকেও আমরা মেলে ধরতে চেয়েছি।” তাঁরা খুশি, ইংরেজি তর্জমায় সাহিত্যের নানা বইও বিকিয়েছে বইপ্রেমীদের মধ্যে।
কলকাতার স্প্যানিশ শিক্ষক দিব্যজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় শহরের স্প্যানিশভাষী স্বেচ্ছাসেবীরা ছিলেন আর্জেন্টিনা ও কলকাতার সেতুবন্ধনে। ভারত-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক এবং আর্জেন্টিনার সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে ইন্দো হিস্পানিক ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকাডেমি প্রকাশিত সংলাপ পত্রিকা ও লস হিস্পানোফিলোস গোষ্ঠীর ত্রিভাষিক সাহিত্য পত্রিকা এল কামিনো প্রকাশিত হয়েছে মেলায়। স্প্যানিশ শিক্ষিকা মালবিকা ভট্টাচার্যের পরিচালনায় আর্জেন্টাইন নাট্যকার আইদা বর্তনিকের ‘পাপা কেরিদা’ (প্রিয় বাবা)-র শ্রুতিনাট্য রূপ মেলে ধরলেন কলকাতার স্প্যানিশবিদেরাই। ছোটদের জন্য লেখা জয়া মিত্রের ‘চার-পাঁচ জন বন্ধু’র স্প্যানিশ তর্জমা ‘উনোস কুয়েন্তোস আমিগোস’-ও মেলাতেই আত্মপ্রকাশ করল। কলকাতায় মুগ্ধ আন্দ্রেস বলে গেলেন, ‘‘থিম দেশ হিসেবে চমৎকার অভিজ্ঞতা। অন্য দূতাবাসের বন্ধুদের বলতেই হবে।’’
২০২৭-এ ৫০তম কলকাতা বইমেলায় একযোগে বর্ণাঢ্য বইমেলা ও বই তীর্থ সাজিয়ে তোলার জন্য বিধাননগর পুর কর্তৃপক্ষের কাছে বাড়তি জায়গার আর্জি জানান গিল্ডের দুই কর্তা ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুধাংশুশেখর দে। ভিড়ের নজির গড়ে ৩২ লক্ষ ছাপিয়েছে কলকাতা বইমেলা। শেষ বেলায় কেউ বাড়তি ছাড়ে পুরনো বই বিক্রি করেছেন। কারও আক্ষেপ, স্টল ছোট বলে সব বই আনা যায়নি। তবু গত বারের ২৩ কোটি বিক্রি অন্তত ১৫ শতাংশ ছাপিয়ে গিয়েছে, দাবি উদ্যোক্তাদের। শেষের এই হাসিটাই বইমেলার শেষ দৃশ্য হয়ে থাকল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)