এ বার কলকাতায় ভার্চুয়াল বক্তৃতা করলেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। প্রায় আধ ঘণ্টার বক্তৃতায় তুলে ধরলেন জুলাই আন্দোলন থেকে শুরু করে আসন্ন নির্বাচনের প্রসঙ্গ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়ে সে দেশে ছাত্র এবং সাধারণ জনতার মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনার দায় নিজের কাঁধে নিলেন জয়। একই সঙ্গে এ-ও জানালেন, ওই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে অনেক পুলিশকর্মী এবং আওয়ামী লীগ কর্মীও খুন হয়েছেন।
সোমবার বিজেপি প্রভাবিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ ‘খোলা হাওয়া’ কলকাতায় এক বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলাদেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর লেখা ওই বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন জয়। সেখানে তিনি বলেন, “কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবি ন্যায্য ছিল। তবে আমাদের সরকার বহু আগেই কোটা সরিয়ে দিয়েছিল। পরে কোর্টের নির্দেশে আবার তা ফেরাতে হয়। কিন্তু আমরা বিষয়টি কোর্টের উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। এটি ছিল একটি ব্যর্থতা”।
বস্তুত, ২০২৪ সালের এই কোটা সংস্কার আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রূপ নেয়। এই আন্দোলনের জেরেই বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতন হয়। ওই আন্দোলন দমাতে হাসিনা-সরকারের পুলিশ যে পদক্ষেপ করেছিল, তা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বার সেই বিতর্কের ব্যাখ্যা দিলেন জয়। হাসিনাপুত্র বলেন, “আমার মায়ের কথোপকথনের অডিয়ো রেকর্ডিং আদালতে পেশ করা হয়েছে। সেখানে আপনারা শুনতে পাবেন, জঙ্গিরা থানায় হামলা করছে— এ বিষয়ে কথোপকথন রয়েছে। ওই সময়েই পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। অনেক নিরপরাধ বিক্ষোভকারী এবং সাধারণ জনতা আক্রান্ত হন। প্রতিটি মৃত্যুই দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের সরকার চায়নি কারও মৃত্যু হোক। কিন্তু হয়েছে। হিংসা সরকার শুরু করেনি, জঙ্গিরা শুরু করেছিল।”
তবে এ ক্ষেত্রে ‘জঙ্গি’ বলতে যে তিনি আন্দোলনকারী ছাত্রদের কথা বোঝাচ্ছেন না, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। জয়ের দাবি, বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে পিছন থেকে মদত দিচ্ছেন ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা। তারা একসঙ্গে মিশে রয়েছে। এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, “আন্দোলনকারীরা কিন্তু ধর্মীয় কট্টরপন্থী বা জঙ্গি ছিলেন না। ওই ধর্মী কট্টরপন্থী এবং জঙ্গিরা আন্দোলনের পিছনে থেকে নিজেদের কাজ করছিলেন। তাঁরাই পরবর্তী সময়ে সমাজমাধ্যমে দাবি করেছেন, আগুন না ধরালে আন্দোলন সফল হত না।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন রয়েছে। তবে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। হাসিনার দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। ফলে নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারেনি তারা। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা প্রসঙ্গে হাসিনাপুত্র বলেন, “ওরা আওয়ামী লীগকে দোষ দিয়ে নিষিদ্ধ করে রেখে দিয়েছে। কারণ, ওরা বলছে আওয়ামী লীগ নাকি ছাত্রদের মেরেছে। আমি তার পুরো দায় নিচ্ছি। অনেক ছাত্র, নিরপরাধ মানুষ আন্দোলনের সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু অনেক পুলিশকর্মী এবং আমাদের অনেক কর্মীও মারা গিয়েছেন।” রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে জয়ের দাবি, “রিপোর্টে যেমন আন্দোলনের সময়ে ১৪০০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, তেমনই এ-ও বলা হয়েছে যে ৫-১৫ অগস্টের মধ্যে কয়েকশো মানুষ খুন হয়েছেন। তখন তো আমাদের সরকার ছিল না। এই দশ দিনে আমাদের কর্মী এবং পুলিশকে খুন করা হয়েছে।”
পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন জয়। তাঁর দাবি, শুধু আওয়ামী লীগকেই ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়নি। বাংলাদেশের অন্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলির উপরেও ‘অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা’ চাপিয়ে রাখা হয়েছে। হাসিনাপুত্রের কথায়, “এটা যেন দ্বিমুখী লড়াই হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়েতের মধ্যে। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির দফতর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের নির্বাচনী কর্মসূচিও করতে দেওয়া হচ্ছে না। এটি একতরফা নির্বাচন হচ্ছে।”
এই নির্বাচনের ফল কী হবে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জয়। বিএনপিকে আমেরিকার ‘হাতের পুতুল’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি। অন্য দিকে, তাঁর দাবি, জামায়েত সরকার না গড়লেও বাইরে থেকে প্রভাব খাটাবে। এমন পরিস্থিতি ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে বলেও দাবি জয়ের। তিনি বলেন, “বিএনপি ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, জামায়েত বাইরে থেকে প্রভাব খাটাবে। বিএনপি আমেরিকার পুতুল হয়ে থাকবে। ফলে জামাত যা খুশি তাই করতে পারবে। পাকিস্তান ফ্রি হ্যান্ড পেয়ে যাবে। এটি ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।” এ অবস্থায় সকল আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী যাতে নির্বাচনের নিন্দা করে, সেই দাবিও জানিয়েছেন তিনি। জয়ের কথায়, “এটাই আপনাদের শেষ সুযোগ কিছু করার। জামায়েতকে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল শক্তি হয়ে ওঠা থেকে আটকানোর এটাই শেষ সুযোগ।”