Advertisement
E-Paper

তোলার তাড়ায় পিষ্ট ৪ শিশু, রোষে পুলিশ

দুর্ঘটনা এড়াতে গাড়ির বেপরোয়া গতি ঠেকানো পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু সোমবার সকালে নিমতার কাছে রবীন্দ্রনগরে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে চার নাবালককে সিমেন্টবোঝাই লরি যে ভাবে পিষে দিল, তার পিছনে পুলিশি তোলাবাজিই দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠিক যেমন গত মাসে ঘটেছিল বীরভূমের ময়ূরেশ্বরে।

শান্তনু ঘোষ ও প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:৩০
জনতার রোষে জ্বলছে পুলিশের গাড়ি। সোমবার বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে। — নিজস্ব চিত্র

জনতার রোষে জ্বলছে পুলিশের গাড়ি। সোমবার বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে। — নিজস্ব চিত্র

দুর্ঘটনা এড়াতে গাড়ির বেপরোয়া গতি ঠেকানো পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু সোমবার সকালে নিমতার কাছে রবীন্দ্রনগরে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে চার নাবালককে সিমেন্টবোঝাই লরি যে ভাবে পিষে দিল, তার পিছনে পুলিশি তোলাবাজিই দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠিক যেমন গত মাসে ঘটেছিল বীরভূমের ময়ূরেশ্বরে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ‘তোলা’ না-দিয়ে পুলিশভ্যানের তাড়া খাওয়া লরিটি গতি বাড়িয়ে পালাতে চেয়েছিল। আর তা করতে গিয়েই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিষে দিয়েছে আত্মীয় দুই পরিবারের চার নাবালককে। তিন জন সকালেই মারা গিয়েছে, এক জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় সল্টলেকের হাসপাতালে ভর্তি। তার ডান পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। সন্ধ্যায় নবান্ন থেকে বেরোনোর সময়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘খুব দুঃখজনক ঘটনা।’’ ডিজি জিএমপি রেড্ডির কাছে বিস্তারিত বিবরণ চেয়েছেন স্বরাষ্ট্র-সচিব মলয় দে।

এ দিন ক্ষিপ্ত জনতার রোষ কিন্তু আছড়ে পড়েছে মূলত পুলিশেরই উপরে। ঘাতক লরিটির উইন্ডস্ক্রিন শুধু ভাঙা হয়েছে। অন্য দিকে ভেঙেচুরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশের দু’টো গাড়ি। একটা রাইফেলও পুড়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাপক মারধর করা হয়েছে পুলিশকর্মীদের। দুই কনস্টেবল পালিয়ে গিয়েছিলেন কিছু দূরের আলিপুর বাজারে। তাঁদেরও টেনে বার করে রড দিয়ে পেটানো হয়েছে। কয়েক জন পুলিশের মাথা ফেটেছে, হাত ভেঙেছে। বস্তুত জনরোষ এতই তীব্র ছিল যে, এক পুলিশ অফিসারের কোমরের রিভলভার ছিনিয়ে এক যুবক তাঁর পেটে ঠেকিয়ে বলে, ‘‘শুধু টাকা তোলা? এ বার এটা চালিয়ে দিই?’’

সকাল ৮টা নাগাদ দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে সিমেন্টবোঝাই লরিটি বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বসিরহাটের দিকে যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আদর্শনগর থেকে লরিটিকে তাড়া করেছিল ব্যারাকপুর কমিশনারেটের রেডিও ফ্লাইং স্কোয়াডের (আরএফএস) ১৫ নম্বর গাড়ি। এলাকাবাসীর দাবি, ওই জায়গায় বহু মালবাহী গাড়ি দাঁড় করিয়ে পুলিশ নিয়মিত টাকা আদায় করে। লরিটা কোনও ভাবে ফাঁক গলে গিয়েছিল।

সন্তানহারা। সোমবার আর জি করে আদিত্য-অর্জুনের মা। সুদীপ্ত ভৌমিকের তোলা ছবি।

এবং তিনশো মিটার দূরে রবীন্দ্রনগর বাসস্টপে তখন একটি বাস দাঁড়িয়ে। বাসস্টপ লাগোয়া বাগানের রেলিং ঘেঁষে ছেলে যুগ হেলা (৭) ও তিন ভাগ্নে আদিত্য হেলা (১৪), অনু হেলা (১১), অর্জুন হেলাকে (৮) নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সন্দীপ হেলা। তাড়া খাওয়া লরি বাসকে কাটিয়ে গিয়েই বেসামাল হয়ে রেলিংয়ে আছড়ে পড়ে। পিষে যায় চার বালক। আদিত্য, অর্জুন ও যুগ মারা যায়।

প্রবল হইচই বেধে যায়। তারই মধ্যে ধাওয়াকারী পুলিশভ্যান এসে লরিচালকের সঙ্গে সন্দীপকেও তুলে নিতে চাইছে দেখে আগুনে ঘি পড়ে। সারদা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত দেবযানী মুখোপাধ্যায়কে ‘এসকর্ট’ করে নিয়ে গিয়ে ফেরার পথে আর একটি পুলিশের গাড়িও হামলার মুখে পড়ে যায়। বাড়ির মহিলারা পর্যন্ত বেরিয়ে এসে বলতে থাকেন, ‘‘ওদের আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক। আমরাই বুঝে নেব।’’ বহু মহিলাও পুলিশকে উত্তমমধ্যম দেন। পুলিশ পালানোর সময়ে একটা গাড়িতে রাইফেল ফেলে গিয়েছিল। গাড়ির সঙ্গে সেটিও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। শেষে জনতা এক্সপ্রেসওয়ের দু’প্রান্ত আটকে বসে পড়ে। সকাল দশটা নাগাদ বিশাল পুলিশবাহিনী গিয়ে লাঠিচার্জ করলে জনতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় ইটবৃষ্টি। ফের পিছু হটতে হয় পুলিশকে।

তখন আসরে নামেন নেতা ও স্থানীয় কাউন্সিলরেরা। তাতেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। বাসিন্দারা বলেন, ‘‘পুলিশের তোলাবাজি বন্ধ হবে, এই প্রতিশ্রুতি চাই।’’ সেই দাবি নিয়ে সন্ধেতেও এক্সপ্রেসওয়ের দু’প্রান্তে বহু পুরুষ-মহিলারা বসে ছিলেন। ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার নীরজকুমার সিংহ অবশ্য বলেন, ‘‘পুলিশের তোলাবাজি নিয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। পেলে অবশ্যই বিভাগীয় তদন্ত করব।’’ ব্যারাকপুর কমিশনারেটের দাবি, পাঁচ পুলিশ জখম হয়েছেন। দুর্ঘটনা ও মারধর-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দমদম থানায় দু’টো মামলা রুজু হয়েছে। ঘটনার পরেই চম্পট দেয় লরিচালক পরিমল বিশ্বাস। রাতে অবশ্য তাঁকে বসিরহাট থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে বিকেলে এয়ারপোর্ট এলাকায় হেলা-বাড়িতে যান খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ও পর্যটনমন্ত্রী তথা স্থানীয় বিধায়ক ব্রাত্য বসু। ব্রাত্যবাবুর কথায়, ‘‘বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে পুলিশের টাকা তোলার অভিযোগ স্থানীয় সূত্রেই জেনেছি। সিপি-কে রিপোর্ট দিতে বলেছি।’’ জ্যোতিপ্রিয়বাবুর বক্তব্য, ‘‘মৃত তিন নাবালক দু’টি পরিবারের। দুই পরিবারের মোট দু’জনকে চাকরি দেওয়া হবে।’’

কিন্তু চাকরি দিয়ে বাচ্চাগুলোর জীবন ফেরানো যাবে কি?— প্রশ্ন তুলছে স্থানীয় মানুষ। যাঁর বাড়িতে বেড়িয়ে ফেরার পথে বাচ্চাগুলোর প্রাণ গেল, তাদের দিদা সেই সুমিত্রা হেলার দাবি, ‘‘পুলিশ জলপানের পয়সা তুলতে গেল বলেই নাতিগুলো চলে গেল। পুলিশের সাজা চাই।’’ আর টুইটারে বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্রের প্রতিক্রিয়া, ‘বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে কনভেন্ট রোড— সর্বত্র তৃণমূল-পুলিশ আঁতাঁতের ফলে রক্ত ঝরছে।’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy