আনলক পর্বে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য কলকাতা থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের ত্রিলোচনপুরের বাসিন্দা কর্মীকে ফোন করেছিলেন চন্দ্রকোণা রুটের এক বাসমালিক। উত্তরে শুনেছিলেন, ‘‘বাড়ির লোক যেতে দিচ্ছে না। বলছে, ভ্যাকসিন বেরোলে তার পরে কলকাতায় যেতে।’’
এমন অভিজ্ঞতা শুধু ওই বাস মালিকেরই নয়। করোনা পরিস্থিতিতে ভিন্ রাজ্য কিংবা অন্য জেলার বাসিন্দা বাসকর্মীরা অনেকেই করোনা-আতঙ্কে আর শহরে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন না বলেই দাবি একাধিক বাসমালিক সংগঠনের। তবে তারা এটাও জানাচ্ছে যে, শহরে এখনও পুরোপুরি ভাবে বেসরকারি বাস ও মিনিবাস নামেনি। যেটুকু চলছে, তাতে প্রতিদিনের খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে মালিকদের। সেখানে অন্য রাজ্য কিংবা অন্য জেলা থেকে কর্মীদের আসতে বলতে কিংবা চাপও দিতে পারছেন না তাঁরা। কলকাতা থেকে চন্দ্রকোণা রুটের ওই বাসের মালিক তথা বাস-মিনিবাস সমন্বয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অধিকাংশ কর্মীই আসতে চাইছেন না। আর যাঁরা ইচ্ছুক তাঁরাই বা এসে কী করবেন? মালিকদের নিজেদেরই রোজগারের নিশ্চয়তা নেই। সেখানে কর্মীদের মজুরি দেবেন কী করে।’’
মূলত বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ এবং এ রাজ্যের বর্ধমান, মেদিনীপুর, দুই ২৪ পরগনা, হুগলি জেলার প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রায় ৩০ শতাংশ কলকাতার বেসরকারি বাস ও মিনিবাস পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। এঁরা চালক, কন্ডাক্টর কিংবা খালাসির কাজ করেন। কয়েক মাস অন্তর তাঁরা নিজেদের বাড়িতে যেতেন। কেউ আবার ভিন্ রাজ্য থেকে এসে কলকাতাতেই সংসার নিয়ে বসবাস করছেন। মালিকেরা জানান, ভিন্ রাজ্য বা অন্য জেলার বাসিন্দা যে সব কর্মী শহরে একা থাকতেন, তাঁরা পরিযায়ী শ্রমিকেরা যখন বাড়ি ফিরছিলেন তখনই চলে গিয়েছেন। তার পরে থেকে আর আসেননি। কলকাতায় দীর্ঘদিন ধরে বাস চালাতেন বিহারের রণবীর সিংহ। লকডাউনের সময়েই ফিরে গিয়েছেন দেশে। ফোনে আক্ষেপ প্রকাশ করে বললেন, ‘‘কবে আবার কাজে ফিরতে পারব জানি না। মালিককে প্রায়ই ফোন করে খবর নিচ্ছি। কিছুই হচ্ছে না। জমানো টাকাও প্রায় শেষ।’’
মালিকেরা জানাচ্ছেন, এখন রাস্তায় যাত্রীর সংখ্যাও কম। ফলে প্রতিদিন যে টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে তাতে দৈনিক এক জন চালকের ১২ শতাংশ ও কন্ডাক্টরকে ৬ শতাংশ মজুরি দেওয়া ঠিক মতো সম্ভব হচ্ছে না। তাই অধিকাংশ মালিকই সব বাস রাস্তায় নামাচ্ছেন না। ১০টি বাস থাকলে হয়তো চার-পাঁচটি বাস চলছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল বাস-মিনিবাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক প্রদীপনারায়ণ বসু বলেন, ‘‘ডিজেলের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে ন্যূনতম ভাড়া ২০ টাকা হলেও বোধ হয় সমস্যা মিটবে না। যাত্রী কম, রোজগারও কম। সেখানে ভিন্ রাজ্য থেকে কর্মীরা এসে নিজেদের পেট চালাতে পারবেন না।’’
আবার মালিকেরা এটাও জানাচ্ছেন, অন্যান্য জেলার বাসিন্দা কর্মীদের একাংশ নিজেরাই কলকাতায় আসতে চাইছেন না। কারণ হিসেবে তাঁরা কলকাতা ও শহরতলিতে প্রতিদিন করোনা সংক্রমণের বাড়বাড়ন্তের কথাই বলছেন।
বর্ধমানের বাসিন্দা এক বাস কন্ডাক্টরের দাবি, ‘‘পকেটে টাকা থাকলেও এখন শহরে হাসপাতালে শয্যা মিলছে না। সেখানে কাজে গিয়ে আক্রান্ত হলে আমাদের কী হবে?’’ কর্মীদের এই অভিযোগ যুক্তিসঙ্গত বলে মানছেন মালিকেরাও। তাঁরা জানান, যে সব কর্মীরা শহর বা শহরতলিতে থাকেন কিংবা ভিন্ রাজ্য থেকে পরিবার নিয়ে এসে কলকাতাতেই বসবাস করছেন, তাঁরাই শুধু এখন বাস পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। সিটি সাবার্বান বাস
সার্ভিসের সাধারণ সম্পাদক টিটু সাহা বলেন, ‘‘প্রতিনিয়ত জ্বালানির দাম বাড়ছে, রোজগার কমছে। কর্মীদেরও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সব মিলিয়ে কঠিন অসুখে ভুগছেন মালিক থেকে কর্মী, সকলেই!’’
(জরুরি ঘোষণা: কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য কয়েকটি বিশেষ হেল্পলাইন চালু করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এই হেল্পলাইন নম্বরগুলিতে ফোন করলে অ্যাম্বুল্যান্স বা টেলিমেডিসিন সংক্রান্ত পরিষেবা নিয়ে সহায়তা মিলবে। পাশাপাশি থাকছে একটি সার্বিক হেল্পলাইন নম্বরও।
• সার্বিক হেল্পলাইন নম্বর: ১৮০০ ৩১৩ ৪৪৪ ২২২
• টেলিমেডিসিন সংক্রান্ত হেল্পলাইন নম্বর: ০৩৩-২৩৫৭৬০০১
• কোভিড-১৯ আক্রান্তদের অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা সংক্রান্ত হেল্পলাইন নম্বর: ০৩৩-৪০৯০২৯২৯)