আরজি কর হাসপাতালে যে লিফ্টে আটকে দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, সেই লিফ্টের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয়েছিল চলতি মাসের শুরুতেই। যে সংস্থার লিফ্ট, তারা সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ দিন অন্তর হাসপাতালের লিফ্টগুলি পরীক্ষা করে দেখে। মাসে এক বার করে লিফ্টের অডিট হয়। সেগুলি সক্রিয় রয়েছে কি না, সঠিক ভাবে কাজ করছে কি না, দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে তা হয়েছিল মার্চের শুরুর দিকে। সংস্থা সূত্রে খবর, স্বাস্থ্যপরীক্ষায় লিফ্টিতে তেমন কোনও গলদ পাওয়া যায়নি। ওই সংস্থা আরজি করে মোট তিনটি লিফ্ট পরিচালনা করে থাকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতি ক্ষেত্রে লিফ্টের বাইরে আলাদা ‘মেশিন রুম’ থাকে। লিফ্টে যান্ত্রিক কোনও ত্রুটি হলে সেখান লিফ্ট নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দুর্ঘটনার দিন ওই ‘মেশিন রুম’-এ কিছু করা হয়েছিল কি না, তা-ও দেখা হচ্ছে। সূত্রের খবর, ওই দিন ‘মেশিন রুম’-এ কেউ গিয়েছিলেন। কে বা কারা গিয়েছিলেন, তা দেখা হচ্ছে। লিফ্ট সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। লিফ্টের ভিতর কোনও সিসি ক্যামেরা ছিল না। বাইরের ক্যামেরার ফুটেজই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে পূর্ত দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গেও কথা বলবে পুলিশ।
আরও পড়ুন:
কোনও প্রতিষ্ঠানে লিফ্ট ব্যবহার করা হলে তার সঙ্গে নিরাপত্তার নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মানতে হয়। লিফ্টম্যানদের বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে রাখতে হয়। তার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার তিন পাতার নিয়মাবলিও রয়েছে। আরজি করে লিফ্টের নিরাপত্তার কোনও নিয়ম অবহেলিত হয়েছিল কি? লিফ্টম্যানেরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কি পেয়েছিলেন? প্রশ্ন রয়েছে। অরূপের মৃত্যুর প্রতিবাদে রবিবার হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ দেখায় এবিভিপি।
সিসিটিভি ফুটেজ বলছে, শুক্রবার ভোর ৪টে ১৫ মিনিট নাগাদ অরূপদের ট্রমা কেয়ারে অস্ত্রোপচারের ঘরের সামনে দেখা গিয়েছিল। অরূপের দেহ উদ্ধার করে ওয়ার্ডে আনা হয় ৫টা ১২ মিনিটে। কিন্তু যে সংস্থা লিফ্ট পরিচালনা করে, তাদের ভোর সাড়ে ৬টার আগে খবরই দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। দুর্ঘটনার পর লিফ্টটি নির্দিষ্ট ‘টেস্ট টুল’ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার আধিকারিকেরাও সেটি খতিয়ে দেখেছেন। দুর্ঘটনার আগে-পরে বাইরে থেকে সংশ্লিষ্ট লিফ্টের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা-ও দেখছে পুলিশ। সংস্থা সূত্রে খবর, লিফ্টের বাইরের ‘মেশিন রুম’-এ নিরাপত্তার নিয়মাবলির নির্দিষ্ট বই থাকে। তা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, প্রশ্ন উঠছে।
তিন বছরের ছেলের চিকিৎসার জন্য আরজি করে গিয়েছিলেন অরূপ। শৌচাগারে যেতে গিয়ে স্ত্রী, সন্তান-সহ লিফ্টে আটকে পড়েন। অভিযোগ, লিফ্টটি এক বার উপরে উঠে নিজে থেকেই নীচে নামতে শুরু করে। নামতে নামতে পৌঁছে যায় অন্ধকার বেসমেন্টে। এক বার দরজা খুললে কোনও রকমে তাঁরা সেখান থেকে বেরোন। কিন্তু বেরিয়ে দাঁড়ানোর তেমন জায়গা ছিল না। বাইরের লোহার গ্রিলের দরজা ছিল তালাবন্ধ। এই সময়ে স্ত্রী, সন্তানকে বার করে দিতে পারলেও লিফ্টের দরজায় আটকে পড়েন অরূপ নিজে। তাঁর স্ত্রীর বয়ান অনুযায়ী, সিমেন্টের দেওয়ালে ঘষটে অরূপকে নিয়ে লিফ্ট উপরে ওঠে। একসময় তাঁর দেহ গড়িয়ে পড়ে স্ত্রীর কোলে। দীর্ঘ ক্ষণ চিৎকার করলেও কারও সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ। ভাঙা যায়নি দরজার তালাও। পরিবারের দাবি, আরও আগে উদ্ধার করা গেলে অরূপকে বাঁচানো যেত। অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলা রুজু করে পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। লালবাজারের হোমিসাইড বিভাগ তদন্ত করছে। তিন লিফ্টম্যান এবং দুই নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আপাতত তাঁরা পুলিশি হেফাজতে।