Advertisement
E-Paper

বদলেছে অনেক কিছু, তবু বিপদে পাশে থাকেন পড়শিরা

আমি তিতাসপারের ছেলে। ১৯৪৮-এ কুমিল্লার ব্রাহ্মণবেড়িয়া থেকে যখন এ অঞ্চলে এসেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে এলাম। টালিগঞ্জের এই অঞ্চলটা তখন গ্রামই ছিল! সেই সময়ে থাকতাম নানুবাবুর বাজারের কাছে একটি ঘর ভাড়া করে। পরে ১৯৭৫ থেকে ক্ষেত্রমোহন নস্কর রোডে বাড়ি করে বসবাস শুরু।

অমর পাল

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০১৬ ০১:১৫

আমি তিতাসপারের ছেলে। ১৯৪৮-এ কুমিল্লার ব্রাহ্মণবেড়িয়া থেকে যখন এ অঞ্চলে এসেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে এলাম। টালিগঞ্জের এই অঞ্চলটা তখন গ্রামই ছিল! সেই সময়ে থাকতাম নানুবাবুর বাজারের কাছে একটি ঘর ভাড়া করে। পরে ১৯৭৫ থেকে ক্ষেত্রমোহন নস্কর রোডে বাড়ি করে বসবাস শুরু।

আজকের পাড়াটাকে দেখে সে সময়ের কথা গল্প মনে হতে পারে। ঝাঁ চকচকে সারিবদ্ধ নানা রঙের বাড়ি, মাঝেমাঝে আকাশছোঁয়া বহুতল, নিত্য নতুন গজিয়ে ওঠা দোকান আর উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। অদূরে নেতাজি মেট্রো স্টেশন। এক দিকে ম্যুর অ্যাভিনিউ, অন্য দিকে, চণ্ডী ঘোষ রোড থেকে শুরু করে ক্ষেত্রমোহন নস্কর রোড পাকদণ্ডীর মতো ঘুরে আবারও চণ্ডী ঘোষ রোডে গিয়ে মিশেছে। কাছেই বড়ুয়াপাড়া আর অশোকনগর।

এক কথায় এলাকাটা এখন জমজমাট। টালিগঞ্জ পর্যন্ত পাতাল রেল চলাচল শুরু হওয়ার পরে একটু একটু করে অঞ্চলটার উন্নতি হয়েছে। তবে কবি সুভাষ পর্যন্ত পাতাল রেল সম্প্রসারণের পরে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ভাল হয়েছে। অন্যান্য পাড়ার মতোই এখানেও মিলছে উন্নত নাগরিক পরিষেবা। নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার, জঞ্জাল সাফাই, ব্লিচিং আর মশার তেল ছড়ানো হয়। জোরালো আলোয় চারদিক এখন রাতেও উজ্জ্বল। এলাকার কাউন্সিলর ভালই কাজ করছেন। আগের চেয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভাল। তবে পাড়ার রাস্তা চওড়া না হওয়ায় গাড়ি রাখতে সমস্যা হয়।

Advertisement

এক-একটি বাড়ি ভেঙে আশপাশে তৈরি হচ্ছে বহুতল। আসছেন কত নতুন মানুষ। নতুনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগটা কম, তবে পুরনোদের সঙ্গে সুসম্পর্ক আজও বজায় আছে। সময়ের অভাবে তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ কমলেও আজও আছে অন্তরের টান।

ছবি:দেবস্মিতা ভট্টাচার্য

এ পাড়া-ও পাড়া মিলিয়ে কাছাকাছির মধ্যে ছ’-সাতটি দুর্গাপুজো হয়। তখন কয়েক দিনের জন্য বদলে যায় পাড়ার একঘেয়ে ছবিটা। উৎসবের আমেজে ব্যস্ততা ভুলে সকলে মিলেমিশে যান। সময়ের সঙ্গে কমেছে পাড়ার জলসা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তবে দৈনন্দিন জীবনে যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, বিপদে-আপদে এখনও পড়শিদের সাহায্য মেলে। তেমনই পাড়ার উন্নয়নে উৎসাহী এখানকার যুব সম্প্রদায়। প্রয়োজনে তাঁদেরও পাশে পাওয়া যায়। এখনও কাছাকাছির মধ্যে রয়েছেন কিছু চিকিৎসক যাঁরা প্রয়োজনে রাত-বিরেতে রোগীর বাড়িতে যান। তাঁদের মধ্যে বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য, অঞ্জন সরকারের
নাম উল্লেখ্য।

ক্ষীণ হয়ে এসেছে এ পাড়ার আড্ডার পরিবেশ। এক-এক সময়ে তো মনে হয় আড্ডা দেব কার সঙ্গে? সমবয়সী বেশির ভাগই চলে গিয়েছেন আর সমমনস্ক মানুষের সংখ্যাটাও কমেছে। তবে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছুটির দিনে কিছু মানুষকে পাড়ার মোড়ে কিংবা বাড়ির সামনে আড্ডা দিতে দেখা যায়। কিংবা কাছেই আই টি আই-এর সামনে চায়ের দোকানে বা ওয়্যারলেস পার্কেও
বসে আড্ডা।

কম হলেও এ পাড়ায় এখনও কিছুটা খেলাধুলোর পরিবেশ রয়েছে। এখনও ছুটির দিনে ছোটদের খেলতে দেখা যায় কখনও রাস্তার ধারে, কখনও বা মাঠে। এ পাড়া থেকে এখনও হারায়নি ফেরিওয়ালার ডাক। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নানা সময়ে তাঁদের ডাকটা আজও বাঁধা।

সময়ের সঙ্গে পাড়াটার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে কত পুকুর, গাছপালা আর বাগান। অতীতে এখানে ছিল নস্করদের জমিদারি। আজও রয়েছে তাঁদের শিব মন্দির। সে কালে চালাঘরের দাওয়ায় বসে অলস দুপুরে হুঁকোয় সুখটান দিতেন প্রবীণরা। পুকুরের স্বচ্ছ জলে ভেসে বেড়াত হাঁস আর সন্ধ্যার পরে মনের সুখে ডানা মেলত শত শত জোনাকি। তখন পাকা বাড়ি ছিল খুবই কম। আজ যত দূর চোখ যায়, শুধু বড় বড় বাড়ি। তখন সকালটা শুরু হত শরীরচর্চা আর উনুনের ধোঁয়ায়। এখন শরীরচর্চা হয় অভিজাত জিমে আর চায়ের দোকানে উনুনের পরিবর্তে এসেছে গ্যাস স্টোভ।

মনে পড়ছে দেশ থেকে এসে ঢেকিতে চাল ভাঙিয়ে আনতে পুঁটিয়ারি বাজারে যেতে হত নৌকায় টালিনালা পার হয়ে। তখন নৌকার ভাড়া ছিল এক পয়সা। সেখানে জোয়ারের সময়ে চলাচল করত পণ্যবাহী নৌকা। এখন সেই টালিনালার উপর দিয়েই দুরন্ত গতিতে ছুটে যায় সারা দিনের বিরামহীন পাতাল রেল। দেখে ভাল লাগে কত উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

আগে এই অঞ্চলটাকে মানুষ চিনতেন মূলত স্টুডিও পাড়া সংলগ্ন এলাকা হিসেবে। কাছেই বেশ কিছু নামকরা স্টুডিও। দেখেছি বহু অভিনেতা-পরিচালককেও। মনে পড়ছে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওর পাশে একটি ঘরে মহড়ায় আসতেন রাইচাঁদ বড়াল। আসতেন পঙ্কজকুমার মল্লিকও। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বহু বার তাঁদের দেখেছি। পরে অবশ্য দু’জনের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছিল।

দেখতে দেখতে এত বছরের পরিচিত পাড়াটার চেহারাটাই বদলে গিয়েছে। এক-এক সময়ে চিনতেই পারি না আমার পাড়াটাকে। কয়েক বছর আগে কাছে এক অনুষ্ঠান শেষে রাতের দিকে হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে নিজের বাড়িটাই চিনতে পারছিলাম না। অনেক ক্ষণ চক্রব্যূহের মধ্যে ঘুরে অবশেষে বাড়ির নম্বর জিজ্ঞেস করে সে যাত্রায় ফিরেছিলাম। আর এক বার গাড়ি করে ফিরতে গিয়ে পাড়ার মুখটা চিনতে পারছিলাম না। অনেক ক্ষণ এ দিক-ও দিক ঘুরে অবশেষে বাড়িতে ফোন করে ছেলেকে পাড়ার মোড়ে আসতে বলে বাড়ি ফিরেছিলাম।

এক-এক সময়ে মনে হয়, এ পাড়াটাকে নিয়ে প্রতি মুহূর্তে চলছে পরিবর্তনের রঙ্গব্যঙ্গ। বদলে যাচ্ছে মানুষ। তাই বদলাচ্ছে পাড়ার চেহারাও। এ সব দেখতে দেখতে আমার আনমনা মনটা হঠাৎ গুনগুনিয়ে ওঠে ‘‘...আমি যেই দিকে যে চাই, দেখে অবাক বনে যাই, আমি অর্থ কোনও খুঁজে নাহি
পাই রে...’’

লেখক বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত শিল্পী

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy