ভিটামিনের সঙ্গে মুড়ি-মুড়কির মতো জ়িঙ্ক ট্যাবলেট খাওয়াই কি বাড়িয়ে দিচ্ছে মিউকরমাইকোসিসের বিপদ? গত কয়েক দিন ধরে এই ছত্রাকঘটিত রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্যেই চিকিৎসক এবং গবেষক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশ্নটি। যদিও এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি বলেই খবর।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, মিউকর নামে একটি ছত্রাকের সংস্পর্শে এলেই এই সংক্রমণ হয়। সাধারণত মাটি, গাছপালা, পচনশীল ফল ও আনাজে এই ছত্রাক থাকে। করোনায় সুস্থ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তলানিতে পৌঁছয়। শরীরে তখনই এই জাতীয় ছত্রাকের আক্রমণ হয় ভয়ঙ্কর। পাশাপাশি, যে সব রোগীকে দীর্ঘদিন আইসিইউ-তে রেখে চিকিৎসা করাতে হয় বা যাঁদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস রয়েছে, তাঁদের শরীরে বেশি করে এই ধরনের ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।
এই সংক্রমণের ফলে মুখের যে কোনও দিকে হঠাৎ করে ব্যথা শুরু হচ্ছে, দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে বা নাক দিয়ে কালো ও বাদামি রঙের তরল গড়াচ্ছে। ফুসফুস-সহ একাধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে এই ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। জ়িঙ্ক ট্যাবলেট তাতে ইন্ধন দেওয়ার কাজ করছে বলেই
চিকিৎসকদের দাবি।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদারের মতে, “মিউকরমাইকোসিস যে যে কারণে ছড়াচ্ছে, তার সবগুলো নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে এ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস বা অন্য যে সব সমস্যার কথা বলা হয়েছে, তা বহু দিন থেকেই আমাদের রয়েছে। আগেও বহু রোগী দিনের পর দিন আইসিইউ-তে থেকেছেন। অক্সিজেন মাস্কও আগে এখনকার মতো করেই পরানো হত। তখন মিউকরমাইকোসিস সংক্রমণ তা হলে এত বেশি করে দেখা যায়নি কেন? রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার পাশাপাশি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মুড়িমুড়কির মতো জ়িঙ্ক খাওয়া।” তাঁর আরও দাবি, “যে কোনও জিনিস অতিরিক্ত মাত্রায় নেওয়াই খারাপ। গত এক বছরের হিসেব বলে দিচ্ছে যে, ভিটামিন ট্যাবলেটের সঙ্গে জ়িঙ্ক ট্যাবলেটের বিক্রি অত্যধিক মাত্রায় বেড়েছে। যা মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিই বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
এই দাবির সমর্থন পাওয়া গেল ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজিস্ট শান্তনু ত্রিপাঠীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, “কৃত্রিম ভাবে কালচার করে দেখা গিয়েছে, জ়িঙ্ক পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই ধরনের ছত্রাকের বৃদ্ধি বাড়ছে। জ়িঙ্ক কমানো গেলে এই ছত্রাকের বৃদ্ধিও কমে যাচ্ছে। এমনটা মানব শরীরেও হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন এমন অবস্থা যে, কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কি হননি, সেটা জানার আগে থেকেই জ়িঙ্ক খাওয়া শুরু করে দিচ্ছেন। এবং সেটা তাঁরা চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন। এর ফলে ছত্রাক শরীরে হানা দিলেই তার খাদ্য, অর্থাৎ জ়িঙ্ক সে পেয়ে যাচ্ছে।”
‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর হিউম্যান অ্যান্ড অ্যানিমাল মাইকোলজি’র প্রেসিডেন্ট তথা ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব
মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’, চণ্ডীগড়ের অধ্যাপক-চিকিৎসক অরুণালোক চক্রবর্তী অবশ্য বলছেন, “এ প্রসঙ্গে চিকিৎসক মহলে চর্চা চলছে ঠিকই, কিন্তু এখনও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। ফলে এ নিয়ে আলোচনার থেকে মূল বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত কাজ সেরে ফেলতে চাইব। এখন এই রোগের সঙ্গে লড়াইয়ে মূল বিষয়ের একটি, ডায়াবিটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ ছাড়া আরও কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া। সেগুলো করতে পারলেই এই রোগ অনেকটা কাবু হবে।”