হাসপাতালে এখন রোগী দেখছি, নাক ও মুখ মাস্কে ঢেকে, ফেস শিল্ড এবং দু’হাতে গ্লাভস পরে। এক রোগী সামনে বসেই নিজের মাস্ক খুলে সোজা পকেটে চালান করে দিলেন। প্রশ্ন করায় তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর, ‘‘আমার কিছু হবে না, যাঁরা বেশি ভয় পান এ সব তাঁদেরই হয়।”
আরও একটি ঘটনা, এক বয়স্ক প্রতিবেশী মারা গিয়েছেন শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায়। অন্য প্রতিবেশী সেই মৃত ব্যক্তির বন্ধ ঘরে গিয়েছেন কিছু কাজের জন্য। সেখান থেকে বেরিয়ে ঘর তালা বন্ধ করেই অন্য এক প্রতিবেশীকে তিনি বলছেন, ‘‘ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকেছিলাম। কী রোগ ছড়িয়ে আছে তো জানা নেই!’’ তাঁকে যখন বলা হল, ‘মাস্ক পরে ও হ্যান্ড স্যানিটাইজ়ার নিয়ে তো ঢুকতে পারতেন, ঝুঁকি কম থাকত।’ ওঁর উত্তর ছিল, গিয়েই স্নান করে নেবেন, সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। অথচ ওঁর খেয়ালই নেই, ওই সময়টুকুর মধ্যেই তিনি কিন্তু তিন বার আঙুল দিয়ে দাঁত খুঁটেছেন। শুধুমাত্র কোভিড-১৯ পরিস্থিতি উদ্ভূত মানসিক সমস্যার সমাধানে আইএসিপি-র তরফে যে টাস্ক ফোর্স তৈরি হয়েছে, তার সদস্য হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই এ রকম অনেক ঘটনা দেখতে পাচ্ছি।
উপরের আলোচনা থেকে দু’রকম চরিত্র দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম জন হয়তো সচেতনই নন বা বিপদকে লঘু করে দেখার প্রবণতা তাঁর মধ্যে রয়েছে। দ্বিতীয় ব্যক্তি সচেতন। কিন্তু নিজের অজান্তেই কী ভাবে বিপদ আসতে পারে, সেটা আঁচ করতে পারছেন না।
এখন জরুরি
• অস্বস্তির কারণ খুঁজে প্রয়োজন অনুযায়ী আরামদায়ক মাস্ক ব্যবহার করুন
• আগ্রহ বাড়াতে কমবয়সিদের পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং মাস্ক দিন
• এমন নির্দিষ্ট জায়গায় মাস্ক রাখুন, যেখানে সহজে নজর পড়বে
• খেয়াল রাখার জন্য নতুন কিছু নিয়ম মনে মনে তৈরি করুন, যেমন ‘জুতো পরার আগে মাস্ক পরব, চাবি নেওয়ার আগে মাস্ক পরতে হবে’
• প্রতিদিন দু’জনকে মাস্ক ব্যবহারের পদ্ধতি শেখান
বর্তমান পরিস্থিতিতে কারও মাস্ক পরা বা হাত ধোয়ার কথা অজানা নয়। নিঃশ্বাস বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে যে জলকণা (ড্রপলেট) বেরোয়, এক জন সংক্রমিত ব্যক্তির থেকে সেই জলকণা বাতাসে ভেসে কাছে থাকা মানুষের নাক ও মুখ (বাতাস ঢোকার ওই দু’টি পথ) এবং চোখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সেই কারণেই নাক ও মুখ ঢেকে রাখা জরুরি। চোখ ঢাকতে চশমা বা রোদচশমা উপযুক্ত। ফেস-শিল্ড একসঙ্গে তিনটিকেই ঢেকে দেয় বলে আরও বেশি সুরক্ষা দেয় সেটি।
এগুলি না হয় প্রথম ব্যক্তিকে বোঝানো গেল, কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে কী করা যায়? নাক-মুখের জলকণা তো অন্য বস্তুতেও পড়তে পারে এবং সেখানে যখন হাত রাখছি সেই হাত সংক্রমণকে আমার টি-জ়োনে পৌঁছে দিতেই পারে, যেমন করে দ্বিতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয়েছিল। হ্যান্ড স্যানিটাইজ়ার থাকলে উনি হয়তো হাত ধুয়ে ফেলতে পারতেন, তার পর অজান্তে দাঁত খুঁটতে সমস্যা হত না। আরও সুরক্ষিত থাকতেন যদি অন্যের ঘরে মাস্কটা পরে যেতেন।
আরও পড়ুন: কলের লাইনে ঝগড়া, ‘মার’ দম্পতিকে
কিন্তু কিছু মানুষের মাস্ক নিয়ে বিবিধ সমস্যা রয়েছে— ঘাম হয় বেশি, কেমন যেন মনে হয় বাতাস ঢুকছে না, নাক-মুখ কেমন চুলকোতে থাকে। যে কোনও নতুন জিনিসে অসুবিধা হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং সে কারণেই শিশুদের জামাকাপড় পরাতে গেলে তারা বাধা দেয়। তবুও তো আমরা চেষ্টা করে যাই ওদের জামা পরার অভ্যাসটা তৈরি করাতে। একটা সময়ে জামা না পরালেই বরং কান্নাকাটি জুড়ে দেয় ওরা। আমাদের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই। “মাস্ক আমাকে ও আশপাশের মানুষকে সুস্থ রাখবে এবং আমি সেই সুস্থ জীবনটাই চাই”, এই প্রয়োজনীয় বার্তা বার বার নিজের মনে আউড়ে গেলে মাস্ক পরা রপ্ত করাটা অনেক বেশি সহজ হয়ে যাবে।
লেখক ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টস-এর ডিজ়াস্টার ম্যানেজমেন্ট টাস্ক ফোর্সের সদস্য