চিংড়িঘাটায় মেট্রোর কাজের জট যেন কেটেও কাটছে না! রাজ্যের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলা হয়েছে মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফে। কলকাতা হাই কোর্ট সময় বেঁধে দিয়ে বকেয়া কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে তার আগেই উচ্চ আদালতের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হল পশ্চিমবঙ্গের সরকার। সোমবার তাদের তরফে দেশের শীর্ষ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আগামী সপ্তাহে রাজ্যের আবেদনের ভিত্তি দায়ের হওয়া মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
চিংড়িঘাটা মোড়ে মেট্রোর কাজ থমকে অনেক দিন ধরেই। নিউ গড়িয়া থেকে কলকাতা বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো লাইনের সম্প্রসারণের কাজ আটকে রয়েছে। মাত্র ৩১৬ বর্গমিটার অংশে কাজ অসম্পূর্ণ। সেই অংশটা ঠিক চিংড়িঘাটা মোড়ে। অভিযোগ, ওই অংশে কাজের জন্য বাইপাসে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু রাজ্য সরকার সেই অনুমতি না-দেওয়ায় কাজ এগোনো সম্ভব হচ্ছে না।
বিষয়টি গড়ায় আদালতে। হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। শুনানি চলাকালীন আদালত রাজ্য, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ট্রাফিক), ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশকে (ট্রাফিক) ছাড়পত্র (এনওসি) দেওয়ার নির্দেশ দেয়। উচ্চ আদালত বলে, ‘‘যান চলাচল অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য এনওসি দিতে হবে, যাতে অরেঞ্জ লাইনে মেট্রো প্রকল্পের কাজ করা যায়। গত বছর ৪ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট জানিয়েছিল, ৯ সেপ্টেম্বর পার্ক স্ট্রিটের মেট্রো রেল ভবনে সব পক্ষ বসে বৈঠক করবেন, যাতে সমস্যার সমাধান করে জনস্বার্থে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া যায়। আদালতের নির্দেশ মেনে চিংড়িঘাটা নিয়ে রাজ্য, কেন্দ্র, নির্মাণকারী সংস্থা আরভিএনএল-সহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠক থেকে স্থির হয়, উৎসবের মরসুম শেষে গত বছর নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সপ্তাহান্তে পিলার বসার কাজ হবে। নির্মাণকারী সংস্থা জানায়, গত বছর নভেম্বরে কাজ শুরু করা গেলে ৯ মাসের মধ্যে ওই লাইনের কাজ সম্পন্ন হবে। কিন্তু পরে তারা জানায় প্রয়োজনীয় এনওসি পায়নি। তার পরেই এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করে আরভিএনএল। আদালত আবার বৈঠকে বসে মিটিয়ে নেওয়ার কথা জানায়।
তবে রাজ্য জানায়, বর্ষবরণের অনুষ্ঠান এবং গঙ্গাসাগর মেলার জন্য রাতের ট্রাফিক আটকে দেওয়া সম্ভব নয়। জনস্বার্থ মামলাকারীর আইনজীবীর বক্তব্য, আগের প্রতিশ্রুতি কেন মানা হল না, তার কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা রাজ্য দেয়নি। মাত্র তিন রাত কাজের সুযোগ দিলেই পিলার তৈরি সম্ভব। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতে জানান, এই জনস্বার্থ মামলা গ্রহণযোগ্য নয়। কোন সময় এনওসি দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত। আদালত তারিখ ঠিক করতে পারে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ভারত উৎসবের দেশ। উৎসব শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে কোনও প্রকল্পই এগোবে না। আগের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়ায় আদালত হস্তক্ষেপে বাধ্য।
গত বছর ২৩ ডিসেম্বর হাই কোর্ট নির্দেশ দেয়, ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাজ্য ও ট্রাফিক পুলিশকে পরপর দু’টি সপ্তাহান্তের রাতের ট্রাফিক ব্লকের তারিখ চূড়ান্ত করতে হবে। কবে হবে তা করা হবে, তা ৬ জানুয়ারির মধ্যে আরভিএনএল এবং মেট্রো কর্তৃপক্ষকে জানাবে রাজ্য। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের বেঞ্চ জানায়, আদালতের প্রত্যাশা সব কর্তৃপক্ষ সমন্বয় রেখে কাজ করবে। যাতে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিন্তু বাস্তবে কাজের গতি সেই চিংড়িঘাটাতেই থমকে রয়েছে। ওই ৩১৬ বর্গমিটার অংশে তিনটি পিলার বা স্তম্ভ বসানো নিয়ে মেট্রো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাজ্য সরকারের দড়ি টানাটানি চলছেই। তবে রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ায় বিষয়টি আবার পিছিয়ে গেল বলেই মনে করছেন অনেকে।
কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের পর চিংড়িঘাটায় মেট্রোর কাজ থমকে থাকা নিয়ে রাজ্যের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করেছিলেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, ‘‘রাজ্য সরকার চিংড়িঘাটার মেট্রোর কাজে সহযোগিতা করছে না বলে কাজ থমকে আছে। দেড় বছরের বেশি সময় হয়ে গিয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।’’