রাজ্য প্রশাসনের অন্দরে সমন্বয়বৃদ্ধি এবং জমির চরিত্র বদলের প্রক্রিয়াকে নিখুঁত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার।তবে এই নতুন ব্যবস্থার শুরুতেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, এ বার থেকে জমির ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য যে ‘কম্প্যাটিবিলিটি রিপোর্ট’ বা প্রাথমিক ছাড়পত্র তৈরি করা হবে, তা মূলত ভূমি দফতর ও উন্নয়ন পর্ষদ— এই দুই দফতরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই কাজ করবে। সাধারণমানুষ বা আবেদনকারীরা যেন কোনও ভাবেই এই প্রাথমিকরিপোর্টকে নির্মাণকাজ বা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমতিপত্র হিসেবে ভাবার ভুল না করেন।
এই সতর্কবার্তার নেপথ্যে যুক্তি হল, ভূমি দফতর থেকে জমিরচরিত্র বদলের সঙ্কেত মেলা আর উন্নয়ন পর্ষদ থেকে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন পাওয়া— এই দু’টিসম্পূর্ণ আলাদা আইনি প্রক্রিয়া। অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে জমির ব্যবহারযোগ্যতার সবুজ সঙ্কেত থাকলেও, প্রস্তাবিত নির্মাণ কত তলা হবে বা সেখানে অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থা কেমন থাকবে, সেইকারিগরি বিষয়গুলি খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়ার এক্তিয়ার একমাত্র সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন বা পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষেরই। তাই ভ্রান্তি এড়াতে রাজ্য নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতর আগে ভাগেই জানিয়ে দিয়েছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে আইনিঅনুমোদনের প্রক্রিয়াটি আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকছে।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছিল, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরথেকে জমির চরিত্র পরিবর্তনের (কনভার্সন) অনুমতি পাওয়ার পর যখন কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন বাপরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিত। ১৯৭৯ সালের পশ্চিমবঙ্গ নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা আইনের ধারা অনুযায়ী প্রতিটি অঞ্চলের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘ল্যান্ড ইউজ় ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কন্ট্রোল প্ল্যান’ (এলইউডিসিপি) বা মাস্টার প্ল্যান থাকে। অনেকসময়ে ভূমি দফতরের থেকে চরিত্র বদলের অনুমতি দেওয়া হলেও পরে দেখা যেত সেই জমিতেপ্রস্তাবিত প্রকল্পটি মাস্টার প্ল্যানের পরিপন্থী। এর ফলে আবেদনকারীকে আর্থিক ক্ষতি ও আইনি টানাপড়েনের মুখে পড়তে হত। এই সমস্যা মেটাতেই এখন থেকে জমির চরিত্র বদলের আবেদনের শুরুতেইভূমি দফতর, সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন পর্ষদের কাছ থেকে একটি অভ্যন্তরীণ মতামত বা ‘কম্প্যাটিবিলিটি রিপোর্ট’ চেয়ে নেবে।
নতুন এই নীতি অনুযায়ী, জেলা স্তরের ভূমি আধিকারিকেরাতথ্য পাঠানোর সাত কর্মদিবসের মধ্যেই উন্নয়ন পর্ষদ বা পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষকে তাদের মতামতজানাতে হবে। এই দ্রুত সমন্বয়ের ফলে এক দিকে যেমন সরকারি লালফিতের ফাঁস আলগা হবে, তেমনই অন্য দিকে সাধারণ মানুষের কাছে জমি ব্যবহারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে।প্রশাসন মনে করছে, এই ব্যবস্থার ফলে শিল্প ও আবাসন ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা অনেক বেশি সুরক্ষিত বোধ করবেন, কারণপ্রাথমিক স্তরেই তাঁরা জানতে পারবেন, তাঁদের প্রকল্পটি ওই এলাকার জন্য নির্ধারিত মাস্টার প্ল্যানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার জন্য পর্ষদের নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমেআবেদনের যে ধারা প্রচলিত আছে, তা যথাযথ ভাবে পালন করতেইহবে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলেরাজ্যে পরিকল্পিত নগরায়ণের পথ প্রশস্ত হবে। বিশেষ করে যে সমস্ত এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, সেখানে জলাভূমি বা কৃষিজমি রক্ষার ক্ষেত্রেও এই আন্তঃদফতরসমন্বয় এক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। সব মিলিয়ে, প্রশাসনিকস্বচ্ছতা আনা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি কমানোর লক্ষ্যেইরাজ্য সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)