Advertisement
E-Paper

রোজ বোমাতঙ্ক! কলকাতা থেকে বর্ধমান বা চুঁচুড়া, এই ভুয়ো মেল কি নিছক মজা? না নেপথ্যে অন্য কোনও কারণ? কী করছে পুলিশ

মঙ্গলবার কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালত, নগর দায়রা আদালত এবং জেলার আদালতগুলিতে বোমাতঙ্কের পরে সেই রাতেই কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) তদন্তভার হাতে নেয়। কিন্তু বৃহস্পতিবারও ছবিটা বদলায়নি। এ বার নিশানায় পাসপোর্ট অফিস!

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৭
কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলায় বোমা বিস্ফোরণের হুমকি ইমেলে উদ্বেগ।

কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলায় বোমা বিস্ফোরণের হুমকি ইমেলে উদ্বেগ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

গত মঙ্গলবার থেকে টানা তিন দিন কলকাতা এবং আশপাশের জেলাগুলির কোথাও না কোথাও বোমা বিস্ফোরণের হুমকি ইমেল এসেছে। বৃহস্পতিবার তো খাস কলকাতার পাসপোর্ট অফিসই উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে! হুমকি ইমেল গিয়েছে একাধিক জেলার পোস্ট অফিসেও। কিন্তু কেন বার বার একই ঘটনা? উড়ো ইমেলের প্রেরককে চিহ্নিত করা গেল কি? পুলিশি তদন্তই বা কত দূর?

ওই সব হুমকি ইমেল অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত কোথাও বোমা বিস্ফোরণ হয়নি। কিন্তু ইমেল আসাও বন্ধ হয়নি। পুলিশ তদন্তে নেমে যে খুব বেশি দূর এগোতে পেরেছে তা নয়। কারা এর নেপথ্যে রয়েছে, তা যেমন বার করে ফেলা যায়নি, তেমনই হুমকি আসাও বন্ধ হয়নি। ফলে নিত্যনতুন এলাকায় প্রতিদিন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বোমাতঙ্ক তৈরি হওয়ায় কাজের ব্যাঘাত ঘটছে।

মঙ্গলবার কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালত, নগর দায়রা আদালত এবং জেলার আদালতগুলিতে বোমাতঙ্কের পর সেই রাতেই কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) ঘটনার তদন্তভার হাতে নেয়। তদন্ত শুরু করে সাইবার শাখার পুলিশও। কোন ঠিকানা থেকে ইমেলগুলি এসেছে, এর সঙ্গে অন্য কোনও রাজ্যের যোগ রয়েছে কি না, সে সব খতিয়ে দেখা শুরু হয়। সে দিন পুলিশ তদন্ত নিয়ে সে ভাবে মুখ খুলতে চায়নি। বলা হয়েছিল, তদন্তের স্বার্থেই ‘গোপনীয়তা’ বজায় রাখা জরুরি।

কিন্তু বুধবারও একই ঘটনা ঘটে। আসানসোল এবং সিউড়ির জেলা দায়রা আদালতে বোমা রাখা আছে বলে হুমকি ইমেল যায় সংশ্লিষ্ট জেলা বিচারকদের কাছে। বৃহস্পতিবার কলকাতার ব্রেবোর্ন রোডের পাসপোর্ট অফিসে যে ইমেলটি গিয়েছে, তাতে বিস্ফোরণের সম্ভাব্য সময়ও উল্লেখ করা ছিল। বলা হয়েছিল, দুপুর ১টা ১৫ মিনিট নাগাদ বোমা ফাটতে পারে। কোনও ক্ষেত্রেই তল্লাশিতে কিছু মেলেনি। ইমেলগুলির নেপথ্যে কি কোনও এক জনেরই হাত রয়েছে? না কি একাধিক জায়গা থেকে ভিন্ন ভিন্ন মাথা এক হয়ে ইমেলগুলি পাঠাচ্ছে?

পুলিশ সূত্রের খবর, প্রাথমিক ভাবে প্রেরকের ঠিকানা বা অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে। কোথা থেকে ইমেল এসেছে, এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। তবে দু’দিনের ইমেল আইডি আলাদা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) ব্যবহার করে এই ধরনের হুমকি ইমেল পাঠায় দুষ্কৃতীরা। ব্যবহার করা হয় বিদেশি সার্ভারও। এ ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা উঠে আসছে। ভিপিএন-এর কারণে প্রেরকের ঠিকানা খুঁজে বার করার প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক জটিল। ফলে পুলিশ দ্রুত রহস্য সমাধানের পথে যেতে পারছে না।

তদন্তকারীরা চাইছেন বিভিন্ন ইমেলের মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট ‘প্যাটার্ন’ চিহ্নিত করতে। সেখান থেকে এই আচরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। নিছক মজা করতে কেউ এমন ইমেল পাঠাচ্ছেন কি না, নেপথ্যে বড়সড় কোনও ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, পুলিশ তা-ও জানার চেষ্টা করছে। তবে তদন্তের স্বার্থেই আপাতত এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না আধিকারিকেরা।

কলকাতা ও জেলার আদালতগুলিতে প্রায় একই সময়ে হুমকি ইমেল গিয়েছিল। আদালত উড়িয়ে দেওয়ার কথা লেখা ছিল ইমেলে। দ্রুত আদালত চত্বর খালি করে চিরুনিতল্লাশি চালায় পুলিশ এবং বম্ব স্কোয়াড। পুলিশকুকুর গোটা চত্বর চষে ফেলে। কিন্তু কিছু পাওয়া যায়নি। এর পরের দিন পশ্চিম বর্ধমানের জেলা বিচারককে পাঠানো ইমেলটিতে লেখা হয়, ‘‘আদালতে বোমা রাখা আছে। কিছু ক্ষণ পরেই বিস্ফোরণ হবে।’’ সিউড়ির জেলা আদালতে পাঠানো ইমেলে আরডিএক্স-এরও উল্লেখ ছিল! বিস্ফোরকের চিহ্ন না পাওয়া গেলেও এর ফলে দীর্ঘ ক্ষণ আদালতের কাজ বিঘ্নিত হয়। মামলাকারী, আইনজীবী, বিচারক এবং আদালতের অন্য কর্মীরা বাধ্য হন উৎকণ্ঠার দীর্ঘ প্রহর কাটাতে।

বৃহস্পতিবার শহরের পাসপোর্ট অফিসেও ছবিটা বদলায়নি। ইমেলের খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় পুলিশ। দফতর খালি করে শুরু হয় তল্লাশি। ইমেলে উল্লিখিত সেই ১টা ১৫ মিনিটের আগে-পরে জোরকদমে তল্লাশি চলে। শুধু দফতরের ভিতরে নয়, পাসপোর্ট অফিসের বাইরেও তন্ন তন্ন করে বোমা ও বিস্ফোরক খোঁজা হয়েছে। হুমকি ইমেল পেয়েছে বর্ধমান, চুঁচুড়া, হাওড়া ময়দান, বসিরহাট এবং আসানসোলের পোস্ট অফিসও।

এর আগেও একাধিক বার শহরে বোমাতঙ্ক ছড়িয়েছে। কখনও ছোটদের স্কুলে, কখনও জাদুঘরে বোমা রাখা আছে বলে ইমেল পাঠানো হয়েছিল। বোমার খোঁজ না মিললেও ইমেলের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট হয়রান হতে হয়েছিল। তবে পর পর তিন দিন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বোমার হুমকি এর আগে কখনও আসেনি। কলকাতার পাশাপাশি তদন্তে নেমেছে রাজ্য পুলিশও। তবে ইমেলের উৎস নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে।

সাম্প্রতিক অতীতে দিল্লি, বেঙ্গালুরু, বারাণসী, গাজ়িয়াবাদে বার বার ভুয়ো বোমাতঙ্ক ছড়িয়েছে। দিল্লির সচিবালয়, লালকেল্লা থেকে শুরু করে ছোটদের স্কুল— বিভিন্ন জায়গায় ধারাবাহিক ভাবে বোমার হুমকি ইমেল পাঠানো হয়েছে। তা নিয়ে জেরবার পুলিশ। তবে এর মধ্যে লালকেল্লায় বিস্ফোরণ হয়েছিল। যদিও তার সঙ্গে হুমকি ইমেলের কোনও সম্পর্ক ছিল না। ওই বিস্ফোরণকে সন্ত্রাসবাদী কাজ বলেই ব্যাখ্যা করেছিল দিল্লি পুলিশ। কয়েক সপ্তাহ আগে ভুয়ো বোমাতঙ্কে বেঙ্গালুরু থেকে অহমদাবাদগামী বিমান টানা দু’ঘণ্টা বিমানবন্দরেই দাঁড়িয়েছিল। এখনও পর্যন্ত এই সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধানসূত্র মেলেনি। পাওয়া যায়নি নিশ্চিত উৎসও। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এই সমস্ত বোমা হুমকির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ইমেলগুলির যোগ রয়েছে কি না, তা-ও তদন্তসাপেক্ষ।

বৃহস্পতিবারের পর শুক্র বা শনিবারেও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমন হুমকি ইমেল আসবে কি না, এলেও পুলিশ তার কিনারা করতে পারবে কি না, তা নিয়েই আপাতত কৌতূহলী রাজ্যের মানুষ।

Bomb Threat Kolkata Police West Bengal Police
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy