Advertisement
E-Paper

ছোট প্রতিশ্রুতিই রাখা হয়নি, অথচ বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন অবলীলায়

নজরে বিধানসভা নির্বাচন আর চোখের সামনে প্রেক্ষাগৃহ-ভর্তি কয়েক হাজার দর্শক, যাঁদের নিরানব্বই শতাংশই মহিলা তথা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বুধবারের সেই সভাতেই মুখ্যমন্ত্রী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যাদের জন্য প্রতিশ্রুতি আর নয়া প্রকল্পের ঝুড়ি উপুড় করে দিলেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৫ ২০:৫০

নজরে বিধানসভা নির্বাচন আর চোখের সামনে প্রেক্ষাগৃহ-ভর্তি কয়েক হাজার দর্শক, যাঁদের নিরানব্বই শতাংশই মহিলা তথা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বুধবারের সেই সভাতেই মুখ্যমন্ত্রী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যাদের জন্য প্রতিশ্রুতি আর নয়া প্রকল্পের ঝুড়ি উপুড় করে দিলেন। বাম আমলে কী কী ছিল না এবং তাঁর আমলে মহিলারা কী কী ভাবে সরকারি সাহায্য পেয়ে স্বনির্ভর হয়েছেন তারও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিতে ভোলেননি মুখ্যমন্ত্রী।

এক, দুই, তিন করে গুণে-গুণে হিসাব দিচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী—স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের ৩০ টাকা করে ভর্তুকি দেবে সরকার। অর্থাৎ তাঁরা যদি ১০০ টাকা ঋণ পান, তা হলে ৭০ টাকা তাঁদের দিতে হবে, ৩০ টাকা দেবে সরকার। তাঁদের জন্য ব্যাঙ্কের সুদের হার ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। সদস্যদের কেউ দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে মারা গেলে বিমা-র ১ লক্ষ টাকা পাবেন। পঙ্গু হলে পাবেন ৭৫ হাজার। সারা পৃথিবী জুড়ে বিশ্ব বাংলা হাটের মাধ্যমে তাঁদের তৈরি জিনিস বেচা হবে। অদূর ভবিষ্যতে তাঁদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার যাবতীয় ব্যবস্থা করবে সরকার।

ঘোষণার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর মৃদু ধমক—‘‘এখনও অনেক জেলায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর টাকা পেতে দেরি হচ্ছে। অনেকে অনুমতি পেয়ে গিয়েছে কিন্তু কাজ শুরু করতে পারেনি। জেলাশাসক, জেলা পরিষদ সিরিয়াসলি বিষয়টা দেখুন। সুব্রতদা (মুখোপাধ্যায়)দের বলব, সিরিয়াসলি মান্থলি মনিটর করতে হবে।’’ এখানেই না থেমে বলেছেন, ‘‘এখন তো সব শপিং মল। একটা ‘আনন্দধারা শপিং মল’ তৈরি করুন এঁদের ভাল ভাল জিনিস বিক্রি করার জন্য। আমি আইডিয়াটা দিলাম। জায়গা দরকার হলে ববি (হাকিম)-র সঙ্গে কথা বলুন। রাজারহাট বা কাছাকাছি কোথাও নিন। লোকে জানতে পারলে ঠিক যাবে।’’

সরকারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের স্কুলের পোশাক এবং মিড ডে মিলের খাবার সরকার পুরোপুরি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর থেকেই নিতে চায় বলে এ দিন জানিয়েছেন মমতা। মঞ্চে উপস্থিত থাকা তাঁর মন্ত্রী ও আমলাদের বলেছেন, ‘‘মুড়ি ভেজে মাসে ৬ হাজার টাকা আয় হতে পারে। আমি তো গ্রামে মানুষ। আমি জানি। মুড়ি ভেজে যদি সংসার চালানো যায় সেটা তো সন্মানের। মেয়েরা কী সুন্দর উত্তরীয় বানায়। সুব্রতদাকে বলছি বিশ্ববাংলা হাটে এগুলো মার্কেটিং করতে সারা পৃথিবীতে। বিদেশিরা লুফে নেবে এই সব জিনিস।’’ কথায় কথায় ইমারতির ব্যবসার সঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কাজের তুলনাও করে বসেন তিনি। বলেন, ‘‘ইঁট, বালি সিমেন্ট, চুন, সুরকি-র ব্যবসা যেমন চলে তেমনই এই ব্যবসা হল বাড়িতে বসে নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টুকটুক করে বিশ্বকে জয় করে ফেলা। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। বাণিজ্যে বসত লক্ষ্মী আর আজ মেয়েরা ঘরে-ঘরে লক্ষ্মীর সন্ধানে নেমেছে।’’

কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় কতটা উৎসাহিত বা আশান্বিত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা? নিকট অতীতে কতটা সহযোগিতায় তাঁরা সরকারের থেকে পেয়েছেন?

বিভিন্ন জেলার একাধিক প্রথম সারির স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মত, এইরকম প্রতিশ্রুতি তারা আগেও শুনেছেন কিন্তু তার বাস্তবায়ণ এখনও দেখতে পাননি। আর ভোটের কথা মাথায় রেখে এইরকম ঢালাও প্রকল্প রাজনীতিকরা দিয়েই থাকেন সে ব্যাপারেও তাঁরা ওয়াকিবহাল। তাঁদের মতে, ‘‘প্রতিশ্রুতি ঘোষণার আগে মেয়েদের ঠিক কি দরকার সেটা মেয়েদের সঙ্গে বসেই ঠিক করা হলে ভাল হত।’’

কী দরকার ছিল মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির?

বীরভূমের এক গোষ্ঠীর কথায়, ‘‘সারা বছর আমাদের জিনিস বিক্রি করার জায়গা বলতে নাবার্ড, নেহরু যুবকেন্দ্র আর স্টেট ব্যাঙ্ক আয়োজিত কিছু মেলা। বেশিরভাগই কলকাতা কেন্দ্রিক। সেখানে কতটুকু আর ব্যবসা হয়। কতবার শুনলাম বাইরের বাজারে মাল বিক্রির ব্যবস্থা হবে। কিছুই হল না। বিশ্ব বাংলা হাটেও জিনিস নেওয়া হল না।’’ বাঁকুড়ার এক গোষ্ঠীর অভিযোগ, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে কর্মতীর্থ নাম দিয়ে ছোট ছোট বাজার তৈরি করে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর জিনিস বিক্রির কথা। কিছু খুলেওছে। কিন্তু ক্রেতারা এর কথা জানেনই না। প্রচার নেই। অনেক জায়গায় দাদাগিরি চলে। মেয়েরা নিরাপদ বোধ করে না। দোকান খুলতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রীর উচিত এগুলো আগে ঠিক করা।’’

পূর্ব মেদিনীপুরের এক গোষ্ঠীর বক্তব্য, ‘‘মেয়েরা জানে না তাঁদের তৈরি জিনিস কী ভাবে, কোথায় বেচবে। কী ভাবে জিনিসকে আরও আধুনিক করবে, মান বাড়াবে সেই প্রশিক্ষণ তাঁদের দেওয়া হয় না। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে জিনিস নিয়ে কী ভাবে যাবে বা কী ভাবে সে সব জায়গায় নিজেদের তুলে ধরবে, কথা বলবে সে ব্যাপারে কোনও সাহায্য তাঁরা পান না।’’ গত তিন-সাড়ে তিন মাসে সরকারের থেকে যে প্রয়োজনীয় সাহায্য তাঁরা পাননি সেটা হঠাৎ মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরে পেয়ে যাবেন, সে ব্যাপারে তাঁরা সন্দিহান।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy