সূর্যাস্তের পরেই বদলে গেল গঙ্গার ঘাটের চেহারা!
রবিবার সকাল থেকেই গঙ্গার ঘাটে যেতে শুরু করেছিল প্রতিমা। তবে দু’-একটি করে। সকালে বাজেকদমতলা ঘাটে বিসর্জন হয়েছে দেশপ্রিয় পার্কে পুজো হওয়া প্রতিমারও। ঘাটে ভিড় কম থাকায় দুপুরেও পুলিশ-পুরসভা ধীরেসুস্থে বিসর্জনের কাজ করছিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখেই একের পর এক প্রতিমা আসতে শুরু করল গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে। তার ফলে যানজট ও ভিড় সামাল দিতে তৎপরতা বাড়ল। পুজো কমিটির ভিড়-ঢাকের শব্দে সরগরম হয়ে উঠল বিসর্জনের ঘাট।
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে গঙ্গা সাফাইয়ে নেমেছে কলকাতা বন্দর ও পুরসভা। কাঠামো তুলতে রাখা হয়েছে ক্রেন। সন্ধ্যার পর থেকে একের পর এক প্রতিমা বিসর্জন হওয়ায় গঙ্গায় জমতে শুরু করে কাঠামো। প্রতিমার ভিড়ে পুরসভার জঞ্জাল তোলার গাড়িও গঙ্গার ঘাটে ঢুকতে পারেনি। ভিড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সামলাতে পুজো কমিটির লোকজনদেরও নিমতলা এবং বাজেকদমতলা ঘাটে গঙ্গার কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে মালবাহকেরাই প্রতিমা নিয়ে বিসর্জন দিয়েছেন।
পুরসভা ও বন্দর সূত্রে খবর, সন্ধ্যার পর থেকে বিসর্জনে সমস্যা সৃষ্টি করেছে জোয়ার-ভাটার সময়ও। এ দিন বিকেলে ভাটা হওয়ায় গঙ্গার জলস্তর কমে যায়। বাজে কদমতলা ঘাটে যে ভাসমান ক্রেন রাখা হয়েছিল, জলস্তর কমে যাওয়ায় সেটিরও কাজ করতে সমস্যা হচ্ছিল। রাত আটটার পরে জোয়ার আসতে শুরু করে। নিরাপত্তার কারণে তখন কুড়ি মিনিট বিসর্জন বন্ধ রাখা হয়েছিল।
বাজে কদমতলা ঘাটে কাঠামো সরানোর কাজে নিযুক্ত সংস্থার এক আধিকারিক জানান, এ দিন ভরা কোটাল চলছে। কোটালের সময়ে জোয়ারের জলস্তর যেমন বাড়ে, ভাটার সময়েও ততটাই কমে যায়। এ দিন কাঠামো সরানোর সমস্যার পিছনে সেটাও অন্যতম কারণ। যদিও পুরসভা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের আশ্বাস, সোমবারের মধ্যেই গঙ্গা থেকে সব কাঠামো তুলে ফেলা হবে। এ দিন বিসর্জনের সময় হাজির ছিলেন গঙ্গা মনিটরিং কমিটির সদস্য পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত। তাঁর মতে, ‘‘বড় বড় পুজোর বিসর্জনের জন্য একটা দিন বরাদ্দ। তার উপরে ভাটার জন্য বিসর্জনে সমস্যা হয়েছে।’’
পুরসভা সূত্রে খবর, ১৯টি গঙ্গার ঘাট ও ন’টি পুকুরে শহরের বিভিন্ন প্রতিমার বিসর্জনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদের মধ্যে বাজেকদমতলা ও নিমতলা ঘাটে প্রতিমার ভিড় বেশি ছিল। জাজেস ঘাটেও বিসর্জন হয়েছে। ওই দুই ঘাটে কাঠামো দ্রুততার সঙ্গে সরিয়ে ফেলতে বার্জ ও ক্রেনের ব্যবস্থা করা হয়। ক্রেনের মাধ্যমে নদী থেকে কাঠামো তুলে জঞ্জাল ফেলার গাড়ি করে ধাপায় সরানো হচ্ছিল। বিসর্জনের তদারকি করতে এ দিন বাজে কদমতলা ঘাটে উপস্থিত ছিলেন মেয়র পারিষদ (উদ্যান) দেবাশিস কুমার, মেয়র পারিষদ (জঞ্জাল) দেবব্রত মজুমদার। নিমতলা ঘাটে ছিলেন মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) অতীন ঘোষ। সন্ধ্যায় বিসর্জনের কাজকর্ম পরিদর্শনে বেরোন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ও।
নিরাপত্তার কারণে এ দিন সকাল থেকে ১৯টি গঙ্গার ঘাটে ১০ জন ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। রাখা হয়েছিল বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও। লালবাজারের শীর্ষ কর্তারাও বিভিন্ন ঘাটে ঘুরে তদারকি করেছেন। সন্ধ্যায় পরিস্থিতি পরিদর্শনে বেরোন পুলিশ কমিশনার সুরজিৎ করপুরকায়স্থ। পরে তিনি বলেন, ‘‘পুরসভার সঙ্গে সমন্বয় রেখে আমরা বিভিন্ন ঘাটে কাজ করছি।’’
এ দিন গঙ্গার প্রতিটি ঘাটেই বিসর্জনের বিষাদের সঙ্গে মিশে ছিল আনন্দও। ঢাকের তালে অনেক জায়গাতেই নাচতে শুরু করেছেন পুজো কমিটির সদস্যরা। সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন শহরে আসা বিদেশি পর্যটকেরা। বাবুঘাট, নিমতলার আশপাশে বিসর্জন উপলক্ষে বসে গিয়েছিল ফুচকা, ঝালমুড়ি, ট্রাপিজ খেলাও। এবং এই ভিড়েই বসেছিলেন মৃত্যুঞ্জয় গায়েন, নিমাই বাগের মতো মালবাহকেরা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে পুজোর আগেই চলে আসেন হাজার খানেক মালবাহক। তাঁদের কাঁধে চেপেই প্রতিমা মণ্ডপে ঢোকে। গঙ্গায় বিসর্জনের সময়েও ওই কাঁধই ভরসা দেবী প্রতিমার। প্রতি বছর একই কাজ করে চলা এই মানুষগুলি এ বার কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন। কেন?
মৃত্যুঞ্জয়-নিমাইরা জানান, ঠাকুর বয়ে সাকুল্যে হাজারখানেক টাকা মেলে। এ বার দু’দিন বিসর্জন বন্ধ থাকায় কার্যত বসে থাকতে হয়েছে তাঁদের। দু’দিন আয় তো তেমন হয়নি, উল্টে খাওয়ার জন্য গাঁটের কড়ি খরচ হয়েছে, বলছেন ওঁরা।