রক্ষণাবেক্ষণের কাজ তো শিকেয় উঠেছে বহু দিনই। এ বার যাত্রীদের জানানোর জন্য সামান্য ঘোষণা করার কাজেও অনীহা দেখাতে শুরু করেছেন মেট্রো কর্তৃপক্ষ। যার নিট ফল, কয়েক হাজার যাত্রীর চূড়ান্ত হয়রানি।
বুধবার দুপুরে বেলগাছিয়া স্টেশনে যান্ত্রিক বিভ্রাটে যাত্রী নিয়ে আটকে যায় একটি রেক। কিন্তু ২০ মিনিট কেটে যাওয়ার পরেও যাত্রীরা জানতে পারেননি, ট্রেনটি আদৌ ছাড়বে কি না। এর পরে তাঁরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আরপিএফ-কর্মীকে ধরে ট্রেনের খবর জানতে চান। কিন্তু তিনিও কিছু জানাতে পারেননি। যাত্রীদের ক্ষোভ যখন চরমে উঠেছে, সেই সময়ে মাইকে ঘোষণা করা হয় মেট্রো খারাপ হওয়ার কথা। ততক্ষণে বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়েছে আরও বেশ কয়েকটি মেট্রো। সব স্টেশনেই আছড়ে পড়েছে যাত্রীদের ভিড়। ওই সময়ে শহরের অনেক স্কুল ছুটি হয়। ফলে স্কুল-ফেরত শিশুদেরও ট্রেনের জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই টোকেন ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে সড়কপথে রওনা হন।
কী কারণে এ দিন বন্ধ হল মেট্রো? মেট্রো সূত্রের খবর, বিদ্যুত্বাহী তৃতীয় লাইন থেকে বিদ্যুত্ টানতে পারছিল না রেকটি। ফলে সেটি চালানো যাচ্ছিল না। রেলের পরিভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় ‘নন-মোটরিং’। গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতেও বেলগাছিয়া ও শ্যামবাজারের মধ্যে ‘ডেঞ্জার জোনে’ মেট্রো আটকে থাকার ঘটনায় এই উপসর্গই প্রথমে দেখা গিয়েছিল। তবে এ দিন রেকটি আটকে গিয়েছিল সুড়ঙ্গে নয়, বেলগাছিয়া স্টেশনেই। আর সে কারণেই আতঙ্কের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছেন যাত্রীরা।
কিন্তু রেক না হয় পুরনো। তা হলে কারশেডে কী পরীক্ষা হল, যাতে ট্রেন চালানো শুরু করতেই এমন বিপত্তি হল?
আসলে মেট্রোকর্তারা স্বীকার করুন বা না করুন, ভাল করে পর্যবেক্ষণ না করেই এ দিন রেকটিকে নামানো হয়েছিল। তাই চালানো শুরু হতেই কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে বিপত্তি। আর এই সংক্রমণেই কাবু এখন মেট্রো। বেলগাছিয়ার সুড়ঙ্গের ‘ডেঞ্জার জোনে’ আটকে পড়ার পরে জেনারেল ম্যানেজার কাগজে-কলমে কয়েকটি নির্দেশ দিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু সেগুলি পালন করা হচ্ছে কি না, তা দেখবে কে?
মেট্রোর একাংশের বক্তব্য, জেনারেল ম্যানেজার তো আর রোজ থাকেন না। মেট্রোয় গত দু’বছর কোনও স্থায়ী জেনারেল ম্যানেজার নেই। ফলে প্রশাসনের হাল ধরার মূল কাণ্ডারী না থাকলে যা হওয়ার, তা-ই হচ্ছে। বারংবার মেট্রো আটকে পড়ার ঘটনার পরে এক প্রাক্তন মেট্রোকর্তার উক্তি, ‘‘কলকাতার মেট্রোয় এখন সবাই রাজা, রাজার রাজত্বে।’’
রেল বোর্ড সূত্রের খবর, গত আর্থিক বছরে মেট্রো হারিয়েছে এক কোটিরও বেশি যাত্রী। রেল বোর্ড মেট্রোর কাছে এর কারণ জানতে চেয়ে ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কেন যাত্রী হারাচ্ছে মেট্রো? যাত্রী হারানোর অন্যতম কারণ বেহাল পরিষেবা এবং যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় না রাখা। তা না হলে ট্রেন আটকে গেলেও মাইকে ঘোষণা করে যাত্রীদের জানানো হবে না কেন? বুধবারের এই ঘটনাই প্রমাণ করে, মেট্রোর কর্মসংস্কৃতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে।
বর্তমানে মেট্রোর এক টাকা আয় করতে খরচ করতে হয় তিন টাকা। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে মেট্রোর কর্তা-কর্মীদের কর্মসংস্কৃতিতে অনেক বেশি গতি আনা উচিত ছিল বলে মনে করেন অন্য রেলের কর্তারা। তাঁদের মতে, এই কারণেই রেল বোর্ডের তরফেও কলকাতা মেট্রো নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। এ দিনের ঘটনার পরে প্রচুর যাত্রীকেই স্টেশন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসার সময়ে বলতে শোনা গিয়েছে, “২৫ কিলোমিটার লাইনেই যারা ট্রেন চালাতে পারে না, তারা চালাবে জোকা-বি বা দী বাগ!”