তাপস রায়, সজল ঘোষদের তৃণমূল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। বিধানসভায় বেলেঘাটার বিধায়ক হিসাবে শপথ নেওয়ার পরেই ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য কুণাল ঘোষের। সমাজমাধ্যমে তাঁর এই মন্তব্যে জল্পনা তৈরি হয়েছে। কুণাল জানিয়েছেন, তৃণমূলের ‘আত্মবিশ্লেষণ’ প্রয়োজন।
প্রোটেম স্পিকার হিসাবে বিধানসভায় জয়ীদের বিধায়ক হিসাবে শপথ গ্রহণ করিয়েছেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তাপস। এ বার তিনি বিজেপির টিকিটে মানিকতলা থেকে জিতেছেন। আবার, আর এক প্রাক্তন তৃণমূল নেতা সজল বিজেপির টিকিটে জিতেছেন বরাহনগর কেন্দ্রে। এই দুই নেতার কথাই কুণাল উল্লেখ করেছেন। সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমাকে শপথ পাঠ করালেন প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়। দীর্ঘ দিনের দাদা এবং নেতা। ওঁকে আমরা তৃণমূলে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি, দুর্ভাগ্য। পরে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও ব্যক্তিগত ভাবে তাপসদাকে ভাল বলায় আমাকে দল সাসপেন্ড করেছিল। ঘটনাচক্রে, আমি এখন দলের বিধায়ক এবং বিজেপির হয়ে জিতে আসা তাপসদার হাতে শপথ পাঠ করছি। ভাগ্যচক্র।’
আরও পড়ুন:
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাপস রায় আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপি-তে যোগ দিয়েছিলেন। তখন তিনি বরাহনগরের বিধায়ক। তাপস তৃণমূল ছাড়ার সময় কুণাল নিজে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। রাজ্যের তৎকালীন মন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে সঙ্গে নিয়ে তাপসের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু তাপসের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেননি। সে সময় ধারাবাহিক ভাবে দলের একাংশের বিরুদ্ধে কুণাল মুখ খুলেছিলেন। শাস্তিও পেতে হয়েছিল। পোস্টে সে কথাই তিনি উল্লেখ করেছেন।
সজলের প্রসঙ্গ তুলে কুণাল লিখেছেন, ‘সজল পুরপিতাও বটে। তাপসদা, সজল ঘোষদের বাধ্য করা হয়েছিল দল ছাড়তে। দু’জনকেই রাখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলাম। এখন তাঁরা বিধায়ক। আমি তৃণমূলের সৈনিক। লড়াই চলবে। তবে যাঁর বা যাঁদের জন্য তাপসদা, সজল ও আরও অনেকে দল ছেড়েছে, দলের ক্ষতি হয়েছে, তার পরেও একই রকম হোয়াট্সঅ্যাপ কাঁদুনি পলিটিক্স করে স্বজনপোষণ চলছে, তা খুব আপত্তিকর এবং উদ্বেগের।’ এতে কর্মীরা ধৈর্য হারাচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন কুণাল।
দলের কারও নাম উল্লেখ না-করলেও কুণালের ইঙ্গিত কার দিকে, ক্ষোভ কার বিরুদ্ধে, তা সহজেই অনুমেয়। উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ‘মধুর’ সম্পর্কের কথা সকলেই জানেন। এর আগে একাধিক বার দলের অন্দরের এই কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছিল। কুণালের অভিযোগ ছিল, তাপসের দলত্যাগের অন্যতম কারণ উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপ।
দলনেত্রী মমতার কাছে সরাসরি হোয়াট্সঅ্যাপে ‘আবদার’ করে কাজ হাসিল করে নেওয়ার অভিযোগ সুদীপের বিরুদ্ধে একাধিক বার তুলেছেন কুণাল। সুদীপ মুখ খোলেননি। বৃহস্পতিবারের পোস্টে ‘হোয়াট্সঅ্যাপ কাঁদুনি পলিটিক্স’-এর উল্লেখ করে ফের সে দিকেই কুণাল ফের ইঙ্গিত করেছেন বলে মত অনেকের। তা ছাড়া, কিছু দিন আগে সুদীপের স্ত্রী নয়নাকে তৃণমূল পরিষদীয় দলের উপদলনেতা করেছে। কুণাল প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তা নিয়ে ‘নীরব প্রতিবাদ’ জানিয়েছিলেন। বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মুখ্যসচেতক ফিরহাদ হাকিম এবং অপর পরিষদীয় দলনেতা অসীমা পাত্রকে অভিনন্দন জানালেও নয়নার নামোল্লেখ করেননি। তা নিয়েও বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল।
তৃণমূলের একাংশের মতে, কুণালের পোস্টে বিবিধ ইঙ্গিত রয়েছে। আগামী দিনে তা আরও তীক্ষ্ণ হতে পারে। পাশাপাশি, সুদীপকে নিয়ে দলের অন্দরেও একাংশের মধ্যে যে ক্ষোভ বাড়ছে, তা উত্তর কলকাতার হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপের ফাঁস হয়ে যাওয়া চ্যাট থেকে স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে দল কী করে, সংগঠনে কুণালের মতো নেতাদের ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার।
কুণালের পোস্ট প্রসঙ্গে সজল বলেন, ‘‘আমাকে আটকানোর চেষ্টা একমাত্র কুণালই করেছিলেন। কিন্তু আমি ভীষণ খুশি যে, সে দিন ওঁর কথা শুনিনি। না হলে আজ আমাকেও ‘চোর’ শুনতে হত।’’