কোনও এক জনের ভুলের জন্য সকলের কুৎসা করা ঠিক নয়। বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোমবার বিশ্ব বাংলা মেলা প্রাঙ্গণে ‘শিক্ষক দিবস’ উপলক্ষে রাজ্য সরকারের ‘শিক্ষারত্ন’ প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে একাধিক বিষয়ে মুখ খোলেন তিনি। ভাষণে কারও নাম করেননি মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর কথায় বার বার ছুঁয়ে গিয়েছেন শিক্ষা ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ এবং সে কারণে ঘটনাবলির প্রসঙ্গ। এক বারও নাম করেননি রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের। কিন্তু যা বলেছেন, তার মর্মার্থ— পার্থের ঘটনার কারণে যেন শাসকদল এবং সরকারকে সামগ্রিক ভাবে কাঠগড়ায় তোলা না হয়।
এসএসসি দুর্নীতি-কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন পার্থ। তার পাঁচ দিনের মাথায় পার্থকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছেন মমতা। দল থেকেও সাসপেন্ড করা হয়েছে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে। তার পর থেকেই পার্থের সঙ্গে ‘দূরত্ব’ বজায় রেখেছে রাজ্যের শাসকদল। গরু পাচার কাণ্ডে ধৃত অনুব্রত মণ্ডলের হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যাটন ধরেছেন। একাধিক বার প্রকাশ্যে অনুব্রতের পাশেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু পার্থকে নিয়ে কিছু বলেননি তিনি। সোমবারও পার্থের থেকে দলকে আলাদাই করেছেন মমতা। তবে পাশাপাশিই মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কেলেঙ্কারির কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন, সে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীকে কেন এখনও গ্রেফতার করা হল না?
আরও পড়ুন:
এক জনের কারণে অন্যদের বিরুদ্ধে কুৎসা না-করার কথা বলেও মুখ্যমন্ত্রী মেনে নিয়েছেন যে, একটা ‘ভুল’ হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। একটা মানুষ কী একটা খারাপ করল, সবাইকে খারাপ বললাম, কুৎসা করলাম। এটা ঠিক নয়। অনেক ভাল মানুষও সঙ্গদোষে খারাপ হয়ে যান। তাঁদের জন্য সকলকে কুৎসা করা ঠিক নয়। তাঁদের আমাদের সঠিক পথে আনতে হবে।’’ এই প্রসঙ্গে আরও এক বার মমতা মনে করিয়ে দিয়েছেন নেতাজির উক্তি। বলেছেন, ‘‘নেতাজি বলে গিয়েছিলেন, ভুল করাও আমাদের অধিকার।’’
এর পরেই মুখ্যমন্ত্রী তুলে আনেন বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম দুর্নীতির প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ‘‘ব্যাপম হল, দেখলেন তো। ৫৩ জন আত্মহত্যা করলেন। ওখানে শিক্ষামন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে? নিচু তলায় কেউ করল! দোষটা আসে ওপর তলায়!’’
আরও পড়ুন:
শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে রাজ্যের সাবেক বামফ্রন্ট সরকারকেও একহাত নিয়েছেন মমতা। জানিয়েছেন, আগের সরকারের আমলে কোনও ফাইল মেলেনি বলে ভুল ধরা পড়েনি। মমতার কথায়, ‘‘সিপিএম চলে গেলেও অনেক কর্মী রয়ে গিয়েছেন। তাঁরা যা অসভ্যতা করেছেন! আমরা কারও চাকরি খাইনি। সিপিএম আমলের কাগজ একটাও নেই। ফাইল পাইনি। কাগজ পাইনি। আলমারি পাইনি। কিছু খুঁজে পাইনি। কাগজ আছে বলেই ভুল ধরা পড়ে।’’ সেই প্রসঙ্গেই মমতা তুলে এনেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রসঙ্গ। বলেছেন, ‘‘মনে পড়ে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন চোরেদের মন্ত্রিসভায় কাজ করব না?’’ এর পরে মমতা সিপিএম আমলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একটি দুর্নীতির কথাও উল্লেখ করেন। সেই প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি রায়ের উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘অশোকবাবু বুলেছিলেন, কেউ ভুল করল, তোমরা রেক্টিফাই (শুধরে) করে নাও। সিপিএম আমলে স্বাস্থ্যনিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি উনি বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন!’’’
অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। তাঁর সামনেই মমতা আশ্বাস দেন, যাঁরা বিচার (সরকারি শিক্ষক বা শিক্ষিকার চাকরি) পাননি, তাঁদের তিনিই বিচার দেবেন। মমতার কথায়, ‘‘বিচার যাঁরা পাননি, যদি মনে করেন পাননি, আমাদের থেকেই পাবেন। প্রক্রিয়ার জন্য সময় লাগবে। আমি চাকরি দিতে চাই। কিন্তু মামলা করে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে! কেউ কেউ পিআইএল করে জীবনটাই পিআইএল করে দিল!’’ শিক্ষক দিবসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আরও আশ্বাস দেন, রাজ্যে ৮৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। তাঁর কথায়, ‘‘স্বাধীনতার পর ৬৫-৬৬ বছরে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছিল রাজ্যে। গত ১১ বছরে আরও ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়েছে। ৫১টি নতুন কলেজ করা হয়েছে।’’