৪ মে অর্থাৎ ভোটগণনার সন্ধ্যায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল (ভবানীপুরের গণনাকেন্দ্র) থেকে কালীঘাটের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের বিপর্যয়, ভবানীপুরে তাঁর নিজের হারের পরে নতুন সরকার গঠনও হয়ে গিয়েছে। ১০ দিন পর বৃহস্পতিবার সকালে কালীঘাট থেকে বেরোলেন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী। ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে আইনজীবীর বেশে হাই কোর্টে সওয়াল করতে গিয়েছিলেন মমতা। রাজনৈতিক মহলের অনেকের বক্তব্য, সশরীরে মমতার কোর্টে যাওয়া আসলে দলীয় সংগঠনে অক্সিজেন দেওয়ার কৌশল।
এর মাঝে গত ৫ মে কালীঘাটের বাড়ি থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে গণনাকেন্দ্রে কারচুপির অভিযোগ করেছিলেন মমতা। তার পর ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন বাড়ির উঠোনেই ঘরোয়া উদ্যাপন করেছিলেন। সেই মঞ্চ থেকেই মমতা বাম-কংগ্রেসকে বার্তা দিয়েছিলেন বিজেপি-বিরোধী মঞ্চে শামিল হওয়ার। গত মঙ্গলবার কালীঘাটের বাড়িতে সমাজমাধ্যমে তৃণমূল যোদ্ধাদের নিয়ে একটি বৈঠক করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তার পর বৃহস্পতিবার তিনি আদালতে গেলেন। পাশাপাশি, বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি নিজের বাড়িতে একটি বৈঠক ডেকেছেন। সেখানে দলীয় সাংসদ এবং বেশ কিছু বিধানসভার প্রার্থীকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
তৃণমূল সরকার থেকে সরতেই দল পরিচালনা নিয়ে বিবিধ মত প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছেন একাধিক নেতা। কেউ সরাসরি দায়ী করছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে, কারও কাঠগড়ায় পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিন মুখপাত্রকে শো কজ় করার পরে নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করতে হয়েছে তৃণমূলকে। এ হেন পরিস্থিতিতে সংগঠনের কাঠামো ধরে রাখাই তৃণমূলের কাছে এই মুহূর্তের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রসঙ্গত, তৃণমূল সেই অর্থে সংগঠন নির্ভর দল নয়। সিপিএম বা বিজেপির ক্ষেত্রে যেমন সাংগঠনিক কাঠামোই মূল বিষয়, তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা নয়। বরং তৃণমূল মমতাকেন্দ্রিক দল। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার এক দশকের মধ্যে সিপিএমের মতো সংগঠনভিত্তিক দল শূন্যে পরিণত হয়েছিল। তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা-ই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন বলেই অভিমত অনেকের। সেই প্রেক্ষাপটেই মমতার কোর্টে গিয়ে সওয়াল করাকে নিচুতলার সংগঠনের উদ্দেশে বার্তা হিসাবে দেখছেন অনেকে।
আরও পড়ুন:
মমতা কোর্টে গেলেও আদৌ কি বল পেল তৃণমূলের নিচুতলা? পূর্ব বর্ধমামের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘দিদির মধ্যে লড়াইয়ের খিদে আছে ঠিক কথা। কিন্তু এই মুহূর্তে রাস্তায় নামার পরিস্থিতি নেই। বহু জায়গায় কর্মীরা মানসিক কারণেই ঘরে ঢুকে গিয়েছেন।’’ পশ্চিম মেদিনীপুরের এক পরাজিত প্রার্থী তথা মমতার দীর্ঘ দিনের আস্থাভাজন হিসাবে পরিচিত এক নেতার বক্তব্য, ‘‘ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে দল নির্দেশ দিয়েছিল মিছিল করার। আমরা সেটুকুই করতে পারিনি।’’
একটা সময়ে সিপিএম-বিরোধিতাই ছিল তৃণমূলের ‘মতাদর্শ’। তাতে বলিয়ান হয়ে মমতার আগ্রাসী বিরোধীনেত্রীর ভূমিকা প্রত্যক্ষ করেছে রাজ্য রাজনীতি। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের অনেকের বক্তব্য, সেই পর্বের সঙ্গে এখনকার পর্বের মৌলিক ফারাক, মাঝে তৃণমূল ১৫ বছর শাসকের জায়গায় ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার ক্লেদ যে মমতার দলের বিভিন্ন স্তরে পুরু আস্তরণ ফেলেছে, তা সর্বজনবিদিত। তা ছাড়া মমতা বিরোধী পরিসরে থাকার সময়ে যে নেতারা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই গত দেড় দশকে তৃণমূলের সংগঠনে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছেন। অনেকে রাজনীতিতেই আর সেই অর্থে সক্রিয় নন। ফলে জেলায় জেলায় সংগঠনে যাঁরা গত কয়েক বছরে নেতা হয়ে উঠেছেন, তাঁদের সেই অর্থে বিরোধী রাজনীতির ঝাঁজ দেখানোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। ক্ষমতায় থাকার পর্বেই তাঁদের উত্থান হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় থাকার সুবাদে তৃণমূল নেতারা থাকতেন পুলিশ এবং নিরাপত্তারক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে। সরকার থেকে চলে যাওয়ার পরে সে সবও গিয়েছে। অভিষেকেরও নিরাপত্তার বহর এক ধাক্কায় ছেঁটে ফেলেছে নতুন বিজেপি সরকার। প্রাক্তন শাসকদলের অনেক নেতাই মানছেন, বিবিধ কারণে তাঁদের এখনই রাস্তায় নামার বাস্তব পরিস্থিতি নেই। যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব চাইছেন, যেখানে যেখানে কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, সেখানে যাতে নেতারা পৌঁছোন। কিন্তু সর্বত্র সেই চাওয়া বাস্তবায়িত করা যাচ্ছে না।
ফলে মমতা ব্যক্তিগত ভাবে মামলায় সওয়াল করতে কোর্টে গেলেও তা তৃণমূলকে আলোড়িত করেছে ভিতর ভিতর। কিন্তু রাস্তায় তার প্রতিফলন দেখানোর বাস্তব অবস্থা যে এখনই নেই, তা মানছেন দলের অনেকেই।