পশ্চিমবঙ্গের ভোটে ভরাডুবির পরে দিল্লির পথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা এবং ফিরে আসার লড়াই চলবে তৃণমূল নেত্রীর। আর সেই লড়াইয়ে স্পষ্টতই কংগ্রেসের মুখাপেক্ষী তিনি। ইতিমধ্যেই সনিয়া গান্ধী এবং রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ফোনে তাঁর কথা হয়েছে। রাজনৈতিক সূত্রের খবর, আগামী ৮ জুন রাজধানীতে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের বৈঠকে বিজেপি-বিরোধী ভোটকে যতটা সম্ভব একত্রিত রাখার পক্ষে সওয়াল করবেন তিনি। যে ক’টি আসনে সম্ভব, ‘একের বিরুদ্ধে এক’ প্রার্থী দেওয়ার জন্য কংগ্রেসের সহযোগিতা ও সমর্থনও চাইবেন তিনি। মমতা-ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায়, “ওই দিন বিরোধী রাজনীতির ভাষ্যই বদলে যেতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বোমা ফাটাবেন।”
ঘটনা হল, মমতার নিজের গড়ে ‘বোমা’টি ফাটিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। যার ফলে, রাজ্যে এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর অনুগামীদের বিধানসভার বিরোধী রাজনীতিতেও কোনও ভূমিকা আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন আপাতত লক্ষ্য মমতার। তাঁর হিসেব, লোকসভা ভোটে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারলে, রাজ্যেও শুভেন্দু অধিকারীর সরকার হীনবল হবে। বছরের শেষে রাজ্যে পুরভোটও রয়েছে। সেখানেও সংখ্যালঘু ভোটকে যদি কংগ্রেস এবং তৃণমূল নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ভাগ হওয়া থেকে আটকাতে পারে, সেটাও লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য শুধু তৃণমূল বা কিয়দংশে কংগ্রেসই নয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সিপিএম তথা বাম দলগুলিও সংখ্যালঘু ভোটের জন্য ঝাঁপাবে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফলাফলের পরে মমতা ইতিমধ্যেই কংগ্রেস এবং বাম দলগুলিকে বিজেপির বিরুদ্ধে রাজ্যে একজোট হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। সূত্রের খবর, ইন্ডিয়া-র আসন্ন বৈঠকে বাম দলগুলির কাছেও এক দাবি রাখতে চলেছেন তিনি।
রাজনৈতিক শিবির বলছে, মাঝে দু’বছর ছাড়া ১৯৮৪ সাল থেকে মমতা কখনও বিধায়ক বা সাংসদ পদের বাইরে থাকেননি। এখন তিনি নিজেকে ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও, কোনও সংসদীয় পদ ছাড়া তাঁর পক্ষে কাজ করা মানানসই হবে না বলেই মনে করছেন তাঁর অনুগামীরা। রাজনৈতিক সূত্রের খবর, ভোটের ফল প্রকাশের পরে প্রাথমিক ভাবে বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পাঠানকে পদত্যাগ করিয়ে সেখানে উপনির্বাচনে দাঁড়ানোর চিন্তাভাবনা করেছিল মমতা। সূত্র বলছে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় নাকি এই বার্তা নিয়ে যোগাযোগ করেছিলেন ইউসুফের সঙ্গে। কিন্তু এই তারকা ক্রিকেটার নাকি সম্মত হননি। পাশাপাশি, বসিরহাট আসনে উপনির্বাচন বকেয়া রয়েছে। তৃণমূলের হাজি নুরুল ইসলাম প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছিলেন এই আসনে। তিনি মারা যাওয়ার পরে আসনটি খালি। এই লোকসভা কেন্দ্রের বিধানসভাগুলিতে তৃণমূল-বিরোধী হাওয়ার মধ্যেও দলের ফল ভাল। কিন্তু বিজেপি প্রশাসনের আমলে ভোট হলে বসিরহাটেও মমতার পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক থাকলে ঋতব্রতের পক্ষে এই ‘বিদ্রোহ’ করা সম্ভব হত না বা তিনি পাশে ষাট জন বিধায়কও পেতেন না। না। তাঁকে কারা যে পিছন থেকে অক্সিজেন জোগান দিচ্ছেন, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট বলেই কংগ্রেসের মত।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে প্রথম দিল্লি সফরে বঙ্গভবনে ঋতব্রতের সঙ্গে দেখা হয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। অনেকের মতে, তৃণমূলের ভাঙনের সূত্রপাত হয় সেখান থেকেই।
রাজনীতিকদের মতে, ঋতব্রতদের বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া থেকে স্পষ্ট, আগামী দিনে রাজ্যে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে লোকদেখানো বিরোধিতা হলেও মূলত শাসক শিবিরের অঙ্গুলিহেলনেই চলবেন বিরোধীরা। যাকে বিজেপির ‘বেঙ্গল মডেল’ বলে কটাক্ষ করছেন ‘ইন্ডিয়া’ নেতৃত্ব। তাঁদের কথায়, ‘‘মহারাষ্ট্রে সরকার গড়ার সমর্থন জোগাড় করতে গিয়ে এনসিপি ও শিবসেনায় ভাঙন ধরিয়েছিল বিজেপি। এ ক্ষেত্রে সরকার গড়তে সমর্থনের প্রয়োজন নেই। তাই বিরোধীদের একেবারে পাশে টেনে নেওয়া হয়েছে। এই মডেলের বিশেষত্ব হল, সরকার-বিরোধী উভয়েই আমার।’’
অতীতে অসমে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, বিরোধীদের মধ্যেও তাঁর লোক রয়েছে। কিন্তু গোটা বিরোধী পক্ষই শাসক শিবিরের পাশে রয়েছে, তা জাতীয় রাজনীতিতে সম্ভবত এই প্রথম। একই সঙ্গে এই ভাঙন ধরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোষ্ঠীকেও রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল করে দিতে সক্ষম হল বিজেপি। আগামী দিনে যাতে তিনি বিরোধী নেত্রী হিসেবে সরকারের অস্বস্তির কারণ না হয়ে উঠতে পারেন, তার জন্যই এই কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।
এ দিকে, অপারেশন বিধানসভার পরে দ্বিতীয় পর্ব, অর্থাৎ অপারেশন লোকসভা কবে থেকে চালু হবে তা নিয়ে আজ থেকেই জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তৃণমূলের লোকসভা সাংসদদের একটি অংশ ইতিমধ্যেই পা বাড়িয়ে রেখেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তা হল, ২৭ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ অর্থাৎ ১৮ জন একসঙ্গে দলত্যাগ করলেই তবেই তাঁদের নেওয়ার কথা ভাবা হবে। মূলত দলত্যাগ-বিরোধী আইন এড়াতেই ওই সিদ্ধান্ত। এক দেশ এক ভোট, মহিলা সংরক্ষণের নামে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে বিজেপির ৩৬২ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। এনডিএ-র কাছে তার থেকে ৭০ জন সাংসদ কম রয়েছে। এই আবহে ডিএমকে-র ২২ জন এবং তৃণমূলের অন্তত ১৮ জন যদি শাসক শিবিরের সমর্থনে এগিয়ে আসেন, ওই ব্যবধান অনেকটাই কমে আসবে।
বিজেপির দিকে পা বাড়ালেও, তৃণমূলের বিদ্রোহী ওই সাংসদেরা অবশ্য মেপে পা ফেলার পক্ষপাতী, যাতে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের ফাঁদে সাংসদ পদ খোয়াতে না হয়। ওই সাংসদেরা ইতিমধ্যেই বিজেপিকে বার্তা দিয়েছেন যে, দল বদল না করলেও, প্রয়োজনে তৃণমূলে থেকেই দলের সমালোচনা করবেন তাঁরা। দলনেতা অভিষেক তো বটেই, মমতারও নির্দেশ মানবেন না তাঁরা। বিধানসভায় তৃণমূলকে ভাঙার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন ঋতব্রত। এ ক্ষেত্রে ভোটের পর থেকেই তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব রয়েছেন তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। লোকসভায় দলভাঙাতে আস্তিনের তাস হিসেবে কাকলিকে ব্যবহার করা হয় কি না, তা-ই এখন দেখার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)