Advertisement
E-Paper

দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছে পশ্চিমপাড়ার সেই মোষ

গত পাঁচ বছর ধরে বছরের এই সময়টায় পাড়া জমজমাট থাকে। মাইক বাজে ঝমঝমিয়ে। আলোয় সেজে ওঠে গ্রাম। নতুন জামাকাপড় কেনা হয়। ছোট ছেলেমেয়ের দল সেজেগুজে ঘুরে বেড়ায় গ্রামের রাস্তায় রাস্তায়।

দিলীপ নস্কর

শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০১৬ ০২:০৮

গত পাঁচ বছর ধরে বছরের এই সময়টায় পাড়া জমজমাট থাকে। মাইক বাজে ঝমঝমিয়ে। আলোয় সেজে ওঠে গ্রাম। নতুন জামাকাপড় কেনা হয়। ছোট ছেলেমেয়ের দল সেজেগুজে ঘুরে বেড়ায় গ্রামের রাস্তায় রাস্তায়।

এ বার ছবিটা বদলে গিয়েছে।

গাঁয়ের বেশির ভাগ পুরুষ মানুষ এখনও ঘরে ফেরেনি। চোখের জল মুছতে মুছতে সাঁঝবাতি জ্বালান মহিলারা। অনেক বাড়িতে সেই পরিস্থিতিও নেই। বাইরের অপরিচিত মুখ দেখলেই ঝট করে সেঁধিয়ে যান ঘরের ভিতরে। শনিবার অনেক বলে কয়ে কথা বলা গেল একজনের সঙ্গে। নাম বলতে রাজি হলেন না। জানালেন, ঘটনার পরে বাইরে থেকে ছেলের দল এসে ভেঙেচুরে দিয়েছিল বাড়িঘর। মহিলার কথায়, ‘‘আমরা কেউ কিছু করিনি, জানেন। তবু পুলিশের ভয়ে এমন পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। এদ্দিন পরে ফিরলাম বাড়িতে। কী অবস্থা হয়েছে সব!’’ মহিলা জানান, বাড়ির গবাদি পশুদের খাবার দেওয়ার মতোও অবস্থা নেই। গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, ট্যাপকলের জল কবে থেকে অনর্গল পড়েই চলেছে। বন্ধ করার লোক নেই।

Advertisement

এ হেন পরিস্থিতি ডায়মন্ড হারবারের হরিণডাঙা পঞ্চায়েতের পশ্চিম বাহাদুরপাড়ার। গত ৯ মে রাতে মোষ চুরির অপবাদ দিয়ে এই গ্রামেই পিটিয়ে মারা হয় কৌশিক পুরকাইত নামে আইটিআই পড়ুয়া এক ছাত্রকে। তারপর থেকে একে একে ধরা পড়েছে তৃণমূল নেতা তাপস মল্লিক-সহ ১৩ জন। রাজ্য সরকারের তরফে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে সিআইডিকে।

যে মোষ চুরির রটনা নিয়ে এত কাণ্ড, সেটি বলি হওয়ার কথা ছিল শনিবার রাতে, গ্রামের রক্ষাকালী পুজোয়। কিন্তু পুজোর পরিবেশ আর কোথায়! কালীমন্দিরের পাশের মাঠে কিংবা স্কুল মাঠে গত পাঁচ বছর ধরে এই পুজো উপলক্ষে গোটা গ্রাম ঝলমলিয়ে ওঠে। কিন্তু এ বার সেই রোশনাইটাই উধাও। পুজো হবে না বলে জানালেন গ্রামের কিছু মহিলা। বললেন, ‘‘কে পুজো করবে। গোটা গ্রামটাই তো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’’ কথা বলতে সকলেই ভয় পাচ্ছেন। তাঁরই মধ্যে কাঁদতে কাঁদতে একজন বললেন, ‘‘কী যে একটা কাণ্ড হয়ে গেল। গ্রামের এত বড় বদনাম, পুরো পরিবেশটাকেই বদলে দিয়েছে। আগের বারও কত আত্মীয়-স্বজন এসেছিলেন পুজো উপলক্ষে। এ বার তাঁরাই ফোনে খবর নিচ্ছেন, পুজো হচ্ছে কিনা। হলেও আসা যাবে কিনা, পুলিশ এসে ধরবে কিনা— এই সব।’’

পাশের পূর্ব বাহাদুরপুরে কৌশিকের মাসির বাড়ি। মন্দিরবাজারের গুমকি গ্রাম থেকে সেখানেই মাসির গৃহপ্রবেশের নিমন্ত্রণে এসেছিলেন কৌশিক ওরফে শুভ। শান্তশিষ্ট ছেলেটি রাতের দিকে মোবাইলে কথা বলতে বলতে গিয়েছিলেন পশ্চিমপাড়ার দিকে। সেখানেই কিছু লোক তাঁকে মোষ চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারে।

পূর্বপাড়া আর পশ্চিমপাড়ার রক্ষাকালী পুজো আগে এক সঙ্গেই হতো। ইদানীং আলাদা হচ্ছে। পূর্বপাড়ায় এ বার পুজো হলেও নেহাতই নয় নয় করে। আনন্দের পরিবেশটাই উধাও। পুজোর এক উদ্যোক্তা জানালেন, মাইক বাজানো হচ্ছে না। বাজি ফাটানো হবে না। কোনও আড়ম্বর নেই। এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে শোকের পরিবেশটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি এখানকার মানুষ।

যে মোষ চুরির অপবাদে কৌশিককে পিটিয়ে মেরেছিল জনতা, সেই মোষটার তা হলে কী গতি হল?

পশ্চিমপাড়ার এক বধূ মাথা নিচু করে জানালেন, ‘‘তাকে আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছে মনে হয়।’’ যা শুনে কৌশিকের বাবা কার্তিকবাবুর বিস্ময়, ‘‘আবার হারিয়েছে মোষ! কোনও ষড়যন্ত্র নেই তো!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy