ভোটের দামামা বাজার আগেই দেওয়াল লিখন শুরু হয়েছে জেলায়। কোথাও কোথাও সেই লিখনে স্পষ্ট উঠে উঠেছে ধর্মীয় বিভাজনের স্লোগান। ধর্মীয় আবেগে রাজনীতির ময়দানে হাতিয়ার করতে দেখা গেলেও পুজোর আয়োজন মিলে মিশে গিয়েছেন বাসুদেব মণ্ডল, শেখ শামসুল, রসুল মল্লিকেরা।
পূর্ব মেদিনীপুরের মেহেদিনগর সমুদ্র সৈকত। খেজুরির এক প্রান্তে এক নির্জন তথা মনোরম এলাকা। এখানে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে আছে ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঘন ঝাউ বনের সবুজ ছায়া। এই সৈকত যেন এক আলাদা জগৎ। এখানে রয়েছে মৎস্যজীবীদের গিরি খটি (মৎস্যজীবীদের খুঁটি বা ঘাট)। এখান থেকে মাছ ধরার জন্য ২২টি নৌকা ভাসে বঙ্গোপসাগরের জলে। অন্তত ২৫০ জন ধীবর পরিবারের বাসবাস। এঁদের জীবিকা সম্পূর্ণ সমুদ্র নির্ভর। এখানের বাসিন্দাা মাতেন গঙ্গাপুজোয়। চারদিন ধরে চলে উৎসব ও অনুষ্ঠান। পাশের প্রতাপদিঘি থেকে আসে ঝংকার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে আসে যাত্রার দল। আর সব আয়োজনই করেন খটি কমিটির প্রসিডেন্ট শেখ শামসুল, পুরোহিত তপন চক্রবর্তী বাসুদেব মণ্ডল, রসুল মল্লিক, জুম্মন আলিরার মতো উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরা।
সৈকতে একমাত্র চা-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান চালান শেক জুম্মন আলি। তিনি বলেন, “আমার এই দোকানে কাজের পর সবাই এসে বসেন। সবাই আমরা এক সঙ্গেই পুজোর কাজ করি।” পুরোহিত তপন চক্রবর্তী বলেন, “নৌকা ও সমুদ্র এখানকার মানুষের জীবিকা। উত্তাল সমুদ্রে জীবিকার জন্য যেতে হয় এঁদের। তাই গঙ্গা পুজোর একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম মিলেই এই পুজো হয়।’’ উদ্যোক্তাদের অন্যতম বাসুদেব বলেন, “আমাদের এই গঙ্গা পুজোয় সবাই মিলেই উৎসব করি। হিন্দু-মুসলিম বিভেদ নেই। মুসলমানেরা নৌকায় মিলাদ করে আমাদের সিন্নি দেন। আমরা নৌকায় পুজো করে ওদের প্রসাদ দিয়ে থাকি। প্রতিমা আনা থেকে চারদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব দায়িত্ব আমাদের সবার।’’
মেহেদীনগরের এই গঙ্গা পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি হিন্দু-মুসলিম মিলনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ বলে দাবি স্থানীয় ইতিহাস চর্চাকারী ভোলানাথ পালের। তিনি বলছেন, ‘‘এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই সম্প্রীতির বাঁধন দীর্ঘ সময়ের। হিজলী মসনদি আলা বা শতবর্ষ প্রাচীন তুফান গাজির মেলা— সম্প্রীতির ভিত্তিতেই দুই ধর্মের মানুষকে নিকটে এনেছে।’’
সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই অবিরাম চলে মেহদিনগরবাসীদের জীবন আর সেই জীবনের মাঝে রয়েছে অটুট ধর্মীয় সম্প্রীতি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)