জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে নাশকতার সময় পৌলমী আটার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ। বাবাকে হারানোর ১৬ বছর পরে আজ তিনি একুশের তরুণী। ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন মা যূথিকাও। জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন কলেজ ছাত্রী পৌলমী। এখনও নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট দিনে হাজিরা দিতে হয় ঝাড়গ্রাম দেওয়ানি আদালতে। কারণ, ২০১০ সালের জ্ঞানেশ্বরী-কাণ্ডে নিখোঁজ তাঁর বাবাকে আইনত মৃত ঘোষণার মামলা এখনও বিচারাধীন।
২০১০ সালের ২৭ মে রাতে হাওড়া স্টেশন থেকে আপ জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে মুম্বইয়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন হাওড়ার সালকিয়ার বাসিন্দা প্রসেনজিৎ আটা। এস-থ্রি কোচের আপার বার্থ নম্বর ছিল ২৭। পরিবারের কাছে এখনও রয়েছে ট্রেনের টিকিট ও পিএনআর নম্বর ৬২৪২৪৩৬৩৫০। গভীর রাতে খেমাশুলি ও সরডিহা স্টেশনের মাঝামাঝি রাজাবাঁধে রেললাইনে নাশকতায় লাইনচ্যুত হয় জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস। উল্টো দিক থেকে আসা মালগাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষে মৃত্যু হয় সরকারি হিসাবে ১৪৯ জন যাত্রীর। তাঁদের মধ্যে ২১ জনের দেহ আজও শনাক্ত করা যায়নি। প্রসেনজিৎ তাঁদেরই একজন।
পরিবারের দাবি, প্রসেনজিতের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়েছিল। ২০১০ সালের ২৯ মে ঝাড়গ্রাম জিআরপি থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন তাঁর স্ত্রী যূথিকা আটা। পরিবারের কাছে তার রিসিভড কপিও রয়েছে। যদিও পরে সেই জেনারেল ডায়েরির নথি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ। দেহ শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়াও হয়েছিল। কিন্তু প্রসেনজিতের দেহ চিহ্নিত করা যায়নি। একই পরিস্থিতির মুখোমুখি আরও কয়েকটি পরিবার। তাঁদের অন্যতম কলকাতার সুরেন্দ্র সিং, যাঁর স্ত্রী ও এক ছেলের দেহ আজও অশনাক্ত।
টিকিটের পিএনআর নম্বর ও অন্য নথির ভিত্তিতে রেলের তরফে পাঁচ লক্ষ এবং রাজ্যের তিন লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মিললেও মেলেনি মৃত্যুর শংসাপত্র। ফলে, ব্যাঙ্কে গচ্ছিত টাকা, বিমার অর্থ কিংবা চাকরির সুযোগে বঞ্চিত হয়েছে পরিবার। দুর্ঘটনার পরে ঘোষণা অনুযায়ী, রেলের চাকরির জন্য বহু চেষ্টা করেছিলেন যূথিকা। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর শংসাপত্র না থাকায় সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়। এখন মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন মেয়ে পৌলমী। পৌলমী বলেন, “আদালতে যেতে হয়, কাগজপত্র নিয়ে ঘুরতে হয়। আমরা শুধু চাই বাবার মৃত্যুর সরকারি স্বীকৃতি। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আবেদন, তিনি যেন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি দেখেন।”
মৃত যাত্রীদের পরিবারের আইনজীবী তীর্থঙ্কর ভকত বলেন, “নাশকতার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী ছিলেন। পরে মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন। সরকার গুরুত্ব দিলে এই পরিবারগুলিকে এত বছর ভুগতে হত না।’’ তিনি মনে করিয়ে দেন, কেদারনাথ বিপর্যয়ের সময় উত্তরাখণ্ড সরকার বহু ক্ষেত্রে দেহ না মিললেও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারগুলিকে স্বীকৃতি ও সহায়তা দিয়েছিল। এই আইনজীবীরও আর্জি, ‘‘কেন্দ্র ও রাজ্যে এখন একই সরকার। আবেদন জানাচ্ছি, এই পরিবারগুলির দীর্ঘ দিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হোক।”
জ্ঞানেশ্বরী-কাণ্ডের মূল নাশকতা মামলার বিচারও শেষ হয়নি। সিবিআই তদন্তাধীন মামলায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। বর্তমানে ১৭ জন অভিযুক্ত জামিনে মুক্ত থাকলেও মামলার বিচার চলছে মেদিনীপুরের বিশেষ আদালতে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)