E-Paper

দু’দিনের বেড়ানোই মৃত্যু ডেকে আনল চিকিৎসক দম্পতির

বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শল্য চিকিৎসক, ৩৬ বছরের কুন্তল। স্নাতকোত্তর করার পরে ৩৫ বছরের শৈলজার পোস্টিং হয়েছিল মুর্শিদাবাদে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫২
চিকিৎসক দম্পতি কুন্তল চক্রবর্তী ও শৈলজা ভরদ্বাজ।

চিকিৎসক দম্পতি কুন্তল চক্রবর্তী ও শৈলজা ভরদ্বাজ। ফাইল চিত্র।

সপ্তাহ দুয়েক আগেই নতুন হাসপাতালে পোস্টিং হয়েছিল। আজ, শুক্রবার সেখানে ছিল কাজের দ্বিতীয় দিন। তার আগে চিকিৎসক-স্বামী কুন্তল চক্রবর্তীর সঙ্গে তাজপুরে বেড়াতে গিয়েছিলেন স্ত্রীরোগ চিকিৎসক শৈলজা ভরদ্বাজ। বৃহস্পতিবার পানিহাটির বাড়িতে ফিরে আসার কথা থাকলেও বুধবার রাতে পরিজনেরা জানতে পারেন, সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয়েছে কুন্তল-শৈলজার।

দিনকয়েক আগেই সমুদ্রে ডুবে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবর তাঁরা সকলে শুনেছেন। কিন্তু তেমনই ঘটনা যে তাঁদের পরিবারেও ঘটেছে এবং তাতে দু’জনেরই মৃত্যু হয়েছে, তা যেন এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না কুন্তলের পরিজনদের। এ দিন দুপুরে পানিহাটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বিবেকানন্দ পার্কে কুন্তলের বাড়ির সামনে জড়ো হওয়া পরিজন-প্রতিবেশীরা সকলেই বলছেন, ‘‘ওঁরা নিজেদের গাড়িতে গেলেন। কিন্তু ফিরবেন শববাহী গাড়িতে। এটা কিছুতেই মানতে পারছি না।’’

বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শল্য চিকিৎসক, ৩৬ বছরের কুন্তল। স্নাতকোত্তর করার পরে ৩৫ বছরের শৈলজার পোস্টিং হয়েছিল মুর্শিদাবাদে। আজ, শুক্রবার সেখানেই তাঁর ডিউটি ছিল। মাঝে ছুটি থাকায় বুধবার দুপুরে স্ত্রীকে নিয়ে তাজপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন কুন্তল। নিজেদের গাড়িতে পুরনো চালককে নিয়েই গিয়েছিলেন তাঁরা। সন্ধ্যায় পৌঁছে মা শঙ্করী চক্রবর্তীকে ফোন করেছিলেন কুন্তল।

মন্দারমণি উপকূল থানা সূত্রের খবর, ওই চিকিৎসক দম্পতি বিশ্ব বাংলা পার্কের কাছে গাড়ি রেখে সমুদ্রে নেমেছিলেন। চালকের দাবি, ‘‘পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে অপেক্ষা করছিলাম। ১০-১৫ মিনিট পরে দু’জনকে আর দেখতে পাইনি।’’ পরে স্থানীয় লোকজন দেখেন, ওই দম্পতি জলে ভাসছেন। পুলিশ এসেতাঁদের উদ্ধার করে বালিসাই বড় রঙ্কুয়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দু’জনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন। কুন্তলের মামিমা শ্রাবন্তী সাহা বলেন, ‘‘বুধবার রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ ফোনে খবর আসে। তার পরেই বাড়ির সকলে ওখানেচলে যান।’’ রাতেই বালিসাই হয়ে কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে পৌঁছে যান কুন্তলের বাবা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী ও অন্যেরা। বৃহস্পতিবার সকালে ওই হাসপাতালে ময়না তদন্তের পরে পরিবারের হাতে দেহ দু’টিতুলে দেওয়া হয়েছে। তাজপুর হোটেল-মালিক সংগঠনের সভাপতি শ্যামল দাস বলেন, ‘‘ওঁরা এসে সোজা তাজপুরের দু’নম্বর সৈকতে চলে গিয়েছিলেন। কোনও হোটেলে ওঠেননি।’’ পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট (ডিসিপ্লিন অ্যান্ড ট্রেনিং) মোহিত মোল্লা বলেন, ‘‘পর্যটকদের আরও সতর্ক এবং সচেতন হতে হবে। পুলিশের তরফেও নিবিড় প্রচার করা হচ্ছে।’’

বাবার চাকরির সূত্রে বহু বছর নাগাল্যান্ডে ছিলেন কুন্তল। পরে মামার বাড়ির পাড়া বিবেকানন্দ পার্কের ভাড়া বাড়িতে এসে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে শল্য বিভাগে স্নাতকোত্তর করেন। কোভিডের সময়ে এম আর বাঙুর হাসপাতালে পোস্টিং ছিল কুন্তলের। তার পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি হাসপাতালে যোগ দেন। ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারিতে বিহারের বাসিন্দা শৈলজার সঙ্গে বিয়ে হয় কুন্তলের। সম্প্রতি বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছিলেন শৈলজা। পোস্টিং হয়েছিল মুর্শিদাবাদে। পানিহাটি থেকে মুর্শিদাবাদে যাতায়াতে সমস্যার জন্য সেখানে একটি বাড়িও দেখেছিলেন তিনি। দিনকয়েক আগে ছেলে-বৌমার সঙ্গে গিয়ে সেই বাড়ি দেখে আসেন বিশ্বজিৎ-ও।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কুন্তলদের বাড়িতে ভিড় আত্মীয়দের। পিসি অঞ্জলি চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওরা দু’জনই খুব হাসিখুশি ছিল। দু’জনই ডাক্তার, তাই ছুটিও বেশি ছিল না। একটু ফাঁকা পেয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু এমন যে ঘটেছে, এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।’’ বিকেলে এসে পৌঁছন শৈলজার পরিজনেরাও। ঘটনাটি মানতে পারছেন না তাঁরাও। ছেলে-বৌমার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন কুন্তলের মা। পরিজন-পরিচিতদের দেখলেই প্রশ্ন করছেন, ‘‘কেন এমনটা হল?’’ কোনও মতে চোখের জল চেপে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টার মাঝেই পরিজনেরা বলছেন, ‘‘এই সান্ত্বনার কি কোনও ভাষা আছে? জানি না, কী বলব!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

tajpur

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy