×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৭ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

স্বাস্থ্যে ভুয়ো নিয়োগ

  বরুণ দে
মেদিনীপুর০৭ জুন ২০১৯ ২৩:০৪
সেই বিজ্ঞপ্তি। নিজস্ব চিত্র

সেই বিজ্ঞপ্তি। নিজস্ব চিত্র

চতুর্থ শ্রেণির কর্মীর ভুয়ো নিয়োগপত্র দিয়ে মোটা টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠল পশ্চিম মেদিনীপুরে। সেই নিয়োগপত্রে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরীশচন্দ্র বেরা এবং জেলার স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ শ্যাম পাত্রের নামে সই ও সিলও রয়েছে। দু’জনই অবশ্য জানিয়েছেন, ওই সই তাঁদের নয়, সই জাল করা হয়েছে। অভিযোগ, বিভিন্ন হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নিয়োগের নির্দেশনামা এবং পদাধিকারীদের সই জাল করে এই দুর্নীতি চলছে।
অর্পিতা মাজি এবং কোয়েল মাজি নামে দুই মহিলা এই অভিযোগ করেছেন। দু’জনেরই বাড়ি ডেবরার অর্জুনিতে। তাঁরা জেলা স্বাস্থ্য দফতরে ই-মেল করে অভিযোগ জানিয়েছেন। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরীশচন্দ্র বেরা মানছেন, ‘‘ই-মেলে অভিযোগ পেয়েছি। সব দিক খতিয়ে দেখে উপযুক্ত পদক্ষেপই করা হবে।’’
অর্পিতা ও কোয়েলের দাবি, প্রথমে সনৎ মাইতি নামে এক যুবক তাঁদের স্বাস্থ্য দফতরে কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। ওই ব্যক্তির বাড়িও অর্জুনি এলাকাতেই। সনৎ আবার লক্ষ্মণ ঘাঁটা নামে একজনের সঙ্গে কথা বলান। তারপর লক্ষ্মণ কথা বলান রাজশেখর জানা নামে একজনের সঙ্গে। এই রাজশেখর নিজেকে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর বাড়ি খড়্গপুর ২ ব্লকের হাটসুলতানপুরের পাটগেড়িয়ায়। ওই দুই মহিলার দাবি, চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে তাঁদের থেকে ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে নিয়োগপত্র ও একটি বিজ্ঞপ্তি ধরানো হয়। যেখানে লেখা রয়েছে, ‘আপনাদের জানানো হচ্ছে স্বাস্থ্য আধিকারিক, স্বাস্থ্য ভবন, কলকাতার আদেশক্রমে আপনাদের অস্থায়ী যে ওয়ার্ড বয় নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে তাহা স্বাস্থ্য ভবনের অনুমোদন সাপেক্ষে আপনাদের ১৪.৬.২০১৯ তারিখে মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকর্তার অফিসে নিজ নিজ নিয়োগপত্র নিয়ে কাজে যোগদান করিতে হবে। তারপর ১৭.৬.২০১৯ নির্দিষ্ট ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হাজির হয়ে রিপোর্ট করিতে হবে।’ নীচে লেখা রয়েছে, ‘যে সকল ওয়ার্ড বয় নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে তাহাদের নাম কপিতে দেওয়া হল।’ ওই কপিতে ৯ জনের নাম রয়েছে। তার মধ্যে অর্পিতা, কোয়েলের নামও রয়েছে।
এই ঘটনায় অর্পিতার স্বামী দেবাশিস গোস্বামীর সঙ্গে লক্ষ্মণের কথোপকথনের একটি রেকর্ডিং সামনে এসেছে (সেই রেকর্ডের সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার)। যেখানে লক্ষ্মণকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘মেদিনীপুরে গিয়ে স্যারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে এসেছি। এটা হট চ্যানেল। এটা ওঁর কোটা। স্যরের বাংলোতেই সমস্ত কাজকর্ম হচ্ছে।’ তাঁকে এও বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘শ্যাম পাত্র সই করতে ৩৫ হাজার টাকা নিচ্ছে।’ সেখানে জানানো হয়েছে, যাঁদের ওয়ার্ড বয় হিসেবে নিয়োগ করা হবে তাঁদের মাসিক বেতন হবে ১৬,৫০০ টাকা। লক্ষ্মণের অবশ্য দাবি, ‘‘আমি সরাসরি কিছু করিনি! অন্য একজনের মাধ্যমেই সব হয়েছে।’’ অন্য একজন কে? লক্ষ্মণের জবাব, ‘‘রাজশেখর নামে একজন।’’ রাজশেখরের সঙ্গে এ দিন যোগাযোগ করা যায়নি।
অর্পিতার বক্তব্য, তাঁকে এক-এক সময়ে এক-এক রকম আশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল। তখনই তাঁর সন্দেহ হয়। পরে খোঁজখবর করে জানতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জেলার স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ শ্যাম পাত্রের আবার দাবি, ‘‘নিয়োগপত্রে আমার সই করার অধিকারই নেই। আমার সই জাল করা হয়েছে।’’ জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরীশচন্দ্র বেরাও বলেন, ‘‘ওই নির্দেশনামা এবং নিয়োগপত্র দু’টিই ভুয়ো। চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া কলকাতার স্বাস্থ্য ভবন থেকে হয়। জেলা থেকে কিছু হয় না।’’
জেলা স্বাস্থ্য দফতরের এক সূত্রে খবর, পুরো বিষয়টি স্বাস্থ্য ভবনেও জানানো হয়েছে। ওই সূত্র মনে করিয়ে দিচ্ছে, বছর দুয়েক আগে মালদহে এমন অভিযোগ উঠেছিল। মালদহের তৎকালীন মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক বিষয়টি নিয়ে সরাসরি পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করেছিলেন। এ জেলার ক্ষেত্রে কেন অভিযোগ দায়েরে ‘গড়িমসি’ হচ্ছে, সেই প্রশ্নও উঠছে। ঘটনায় জেলা স্বাস্থ্য দফতরের কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত নয় তো? উঠছে সেই প্রশ্নও।
জেলা পুলিশের এক আধিকারিকের আশ্বাস, ‘‘অভিযোগ পেলে ওই চক্রের সঙ্গে কে বা কারা যুক্ত তা নিয়ে তদন্ত শুরু হবে।’’

Advertisement
Advertisement