ঝাড়গ্রাম জেলায় জঙ্গলের মধ্যেই হাতিকে ‘আটকে’ রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে বন দফতর। জানা গিয়েছে, গিধনী রেঞ্জের জঙ্গলে দু’বছরে ১৬টি পুকুর খনন করা হয়েছে। ১০ হেক্টর এলাকা জুড়ে রোপণ করা হয়েছে ঘাস। ৯০ হেক্টর এলাকা জুড়ে ফলের গাছ রোপণ করা হয়েছে। শাল জঙ্গল বৃদ্ধি করা হয়েছে ৯০ হেক্টর। জল ও মাটি সংরক্ষণের জন্য ২৮০ হেক্টর এলাকায় কাটা হয়েছে ট্রেঞ্চ।
খাবার ও জলের সঙ্কট থাকায় জঙ্গল ছেড়ে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে হাতির দল। বৃদ্ধি পাচ্ছে হাতি ও মানুষের সংঘাত। সম্পত্তি ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানির আশঙ্কাও বাড়ছে। এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটল বন দফতর। জঙ্গলের মধ্যেই হাতির পর্যাপ্ত ও মুখরোচক খাবারের জোগান দিতে তৈরি করা হয়েছে ফলের বাগান। শাল জঙ্গলের ঘনত্ব বৃদ্ধি করা হয়েছে। খনন করা হয়েছে পুকুর।
রবিবার ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের গিধনী রেঞ্জ জুড়ে নির্মীত এই প্রকল্পগুলির উদ্বোধন করেন বনমন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদা। উপস্থিত ছিলেন মুখ্য বনপাল (পশ্চিম চক্র) এস কুনালদাইভেল, ঝাড়গ্রামের বিভাগীয় বন আধিকারিক উমর ইমাম, খড়গপুরের বিভাগীয় বন আধিকারিক মণীশ যাদব, রূপনারায়ণের বিভাগীয় বন আধিকারিক শিবানন্দ রাম-সহ অন্যান্য আধিকারিকেরা। গিধনী রেঞ্জ অফিস প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে ঝাড়গ্রাম বনবিভাগের ২৪টি বন সুরক্ষা কমিটির হাতে বন দফতরের লভ্যাংশের ১ কোটি ২ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকার চেক তুলে দেন মন্ত্রী। তার পর জঙ্গলের মধ্যে হাতির জন্য খনন করা পুকুরগুলি নিজে ঘুরে দেখে তা উদ্বোধন করেন তিনি। কানাইশোল ও আমতলিয়া বিটের ডুমুরিয়া, বড়শোল, আমতলিয়া, চাঁদুয়া ও কেশিয়ায় পুকুর উদ্বোধন এবং বড়রাজগ্রামে পুকুর খননের ভিত্তিপ্রস্তর করার পাশাপাশি পলাশবনিতে হাতির জন্য রোপণ করা আম, কাঁঠাল, কাজু, চালতা, বেল-সহ বিভিন্ন ফল গাছের বাগান পরিদর্শন করেন বনমন্ত্রী। বন দফতর জানিয়েছে, হাতির বাসস্থান গড়ে তুলতে প্রায় ২ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
ঝাড়খণ্ডের দলমা পাহাড় থেকে এক সময় হাতির দল বেলপাহাড়ির ময়ূরঝর্ণা হয়ে ঝাড়গ্রামে ঢুকে পড়ত। বেলপাহাড়ি থেকে নির্দিষ্ট রুট ধরে লালগড় ও তার পর কংসাবতী নদী পেরিয়ে মেদিনীপুর। ফের কংসাবতী পেরিয়ে গুপ্তমণি হয়ে নয়াগ্রামের দিকে চলে যেত হাতির পাল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে হাতি তাদের রুট পরিবর্তন করেছে। বেলপাহাড়ির পরিবর্তে ঝাড়খণ্ডের চাকুলিয়া হয়ে গিধনী রেঞ্জের আমতলিয়া ও কানাইশোল বিট হয়ে জেলায় ঢুকে পড়ছে তারা। ছড়িয়ে পড়ছে জেলা জুড়ে। ফলে হাতির এই রাজ্যে ঢোকার আগেই তাদের বসবাসযোগ্য উপযুক্ত জঙ্গল গড়ে তুলতে গিধনী রেঞ্জের আমতলিয়াকে বেছে নিয়েছে দফতর। তা ছাড়া এই এলাকায় সারা বছরই হাতির আনাগোনা রয়েছে। মাঝে মধ্যে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে হাতির দল ক্ষয়ক্ষতিও করে বলে দাবি স্থানীয়দের। এই পরিস্থিতিতে জঙ্গলেই হাতিকে ‘আটকে’ রাখার জন্য তাদের বসবাসযোগ্য জঙ্গল গড়ে তোলার জন্য বন দফতরের উদ্যোগে খুশি এলাকার মানুষ। আমতলিয়া গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় সারা বছরই হাতি রয়েছে। খাবারের সন্ধানে জঙ্গল ছেড়ে মাঝে মধ্যে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে তারা। বন দফতর তাদের তাড়িয়ে জঙ্গলে পাঠালেও ফের চলে আসে। জঙ্গলের মধ্যেই তাদের খাবার ও জলের জোগানের ব্যবস্থা করেছে দফতর। আশা করা যায়, হাতি আর লোকালয়মুখী হবে না। বন দফতরের এই উদ্যোগকে সাধুবাদও জানিয়েছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
মুখ্য বনপাল (পশ্চিম চক্র) এস কুনালদাইভেল বলেন,‘‘দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে হাতির বসবাসের জন্য অনকে কাজ করা হয়েছে। হাতি ও মানুষের সংঘাত রুখতে মন্ত্রী অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন। জঙ্গলে জলের ব্যবস্থা ও ফলের গাছ রোপণ করা হচ্ছে। জঙ্গলের ভিতরে হাতির থাকার জন্য অনেক কাজ হয়েছে। বনমন্ত্রী বলেন, ‘‘হাতি ও মানুষের সংঘাত রুখতে বনদফতর দিনরাত কাজ করে চলেছে। আগামী দিনে দক্ষিণবঙ্গের হাতি কবলিত প্রতিটি জেলায় হাতির বসবাসের জন্য উপযুক্ত জঙ্গলের পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। অনেক ক্ষেত্রে কাজও চলছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘জঙ্গল রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।’’
প্রকল্পের উদ্বোধনের পরেই বিকেলে গিধনীর জঙ্গলে হাতির জন্য রোপণ করা কলা গাছ ভেঙে খেতে দেখা যায় একটি দাঁতালকে।