শিক্ষার অধিকার থেকেই বঞ্চিত বিনপুরের রানারানি আত্যয়িক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদিবাসী পড়ুয়ারা। বছরের পর বছর একটি মাত্র ছোট ঘরে পাঁচটি ক্লাস চলছে। স্কুলের বেহাল পুরনো ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সেখানে এখন সাপখোপের বাসা। তাই প্রশাসনের তরফে বছর পাঁচেক আগে পৃথক এই ক্লাস ঘরটি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সর্বশিক্ষা মিশনের সরকারি অনুদান না মেলায় স্কুলের অতিরিক্ত ক্লাস ঘর তৈরি হয়নি। বাধ্য হয়েই সাকুল্যে ওই একটি ঘরেই পাঁচটি ক্লাস চলে। সারি সারি বেঞ্চে শিশু থেকে চতুর্থ শ্রেণির ২৯ জন খুদে পড়ুয়ারা একসঙ্গে পাঠ নেয়। ওই ঘরটিই আবার এখন মিড ডে মিলের চালের বস্তা রাখার জায়গা। ক্লাস ঘরেই রয়েছে স্কুলের নথিপত্র রাখার আলমারিও। বকলমে ক্লাস ঘরটিতেই চলে অফিস ঘর। এমনই আবহে হাসিমুখে দিনের পর দিন কঠিন-দায়িত্ব পালন করে চলেছেন দু’জন শিক্ষক। এক একটি বেঞ্চে এক একটি ক্লাসের বসার ব্যবস্থা করে প্রতিদিন একসঙ্গে ক্লাস নিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক শঙ্কর সরকার ও সহশিক্ষক শুভজিৎ দাস। প্রতিটি বেঞ্চে বোর্ড দিয়ে শ্রেণি নির্দিষ্ট করা থাকে। পড়ুয়ারা একসঙ্গে হাতের লেখা অভ্যাস করে। নামতা আওড়ায় একসঙ্গে। নীচু ক্লাসের পড়ুয়ারা শিখে ফেলে উঁচু ক্লাসের নামতা। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পড়ুয়ারাও পুরনো ক্লাসের পড়াগুলি ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তৃতীয় শ্রেণির অর্পিতা বাস্কে, তরুলতা হেমব্রম, চতুর্থ শ্রেণির সুরেশ হাঁসদা-রা জানায়, “প্রথম প্রথম খুব অসুবিধে হতো। এখন আমরা একসঙ্গে পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।” দ্বিতীয় শ্রেণীর সাগুন সরেনের কথায়, “দাদা-দিদিদের পড়া গুলোও আমার শিখে যাচ্ছি।”
স্কুল ও স্থানীয় সূত্রের খবর, পুরনো স্কুল ভবনটি বেহাল হয়ে পড়ায় ২০১০ সালে পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরের বরাদ্দ টাকায় বিনপুর-১ ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে একটি পৃথক ক্লাস ঘর করে দেওয়া হয়। ওই ঘরটিই এখন একইসঙ্গে শ্রেণী কক্ষ, চালের মজুত ঘর ও অফিস ঘর।
বিনপুর-১ ব্লকের আঁধারিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এই রানারানি গ্রামের সিংহভাগ বাসিন্দা আদিবাসী সম্প্রদায়ের। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৯ জন পড়ুয়ার বেশিরভাগই আদিবাসী। অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুলের অতিরিক্ত ক্লাস ঘর প্রয়োজন। অথচ একটি ঘরে একসঙ্গে পাঁচটি ক্লাস চালানো হচ্ছে। এতে পড়ুয়াদের ভীষণই সমস্যা হচ্ছে। অথচ আদিবাসী পড়ুয়াদের এই স্কুলে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। কিচেন কাম স্টোর রুমটির সংস্কার কাজ চলায় এখন আবার মিড ডে মিলের চালের বস্তাগুলিরও ঠাঁই হয়েছে ক্লাস ঘরে।
প্রধান শিক্ষক শঙ্কর সরকার বলেন, “অতিরিক্ত ক্লাস ঘরের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মহলে আবেদন জানিয়েছি। নতুন ভর্তি হওয়া পড়ুয়াদের সমস্যা হয়। ধীরে ধীরে ওরা অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে যায়। আমরা সব সময় পড়ুয়াদের সদর্থক মনোভাব তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছি। ওদের বোঝাই এর চেয়েও অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়াশুনা করে আমাদের জেলার ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর।”
বিনপুর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কৃষ্ণগোপাল রায় বলেন, “বিষয়টি জানি। শিক্ষকদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। অতিরিক্ত ক্লাস ঘর তৈরির অর্থ বরাদ্দের জন্য সর্বশিক্ষা মিশন কর্তৃপক্ষ-কে চিঠি দেব।” জেলা সর্বশিক্ষা মিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, যে সব স্কুলে পড়ুয়া সংখ্যা বেশি সেই স্কুল গুলিতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভবন তৈরির টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। রানারানি স্কুলের জন্য এখনও অর্থ বরাদ্দের কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
এলাকার বাসিন্দাদের অবশ্য দাবি, পাশের গ্রামের অন্য একটি প্রাথমিক স্কুলে মাত্র ১৪ জন পড়ুয়া থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ক্লাস ঘরের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আদিবাসী পড়ুয়াদের স্কুলটি অবহেলিত থেকে গিয়েছে।