বেশিরভাগ ছোট প্রকল্পের কাজ সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিংবা একটু বেশি সময় লাগছে। অথচ, বড় প্রকল্প রয়েছে থমকে। পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরের বিভিন্ন কাজের এমনই হাল জঙ্গলমহলের জেলা পশ্চিম মেদিনীপুরে।
এমনিতেই প্রকল্পের অনুমোদন পেতে, সেই খাতে অর্থ বরাদ্দ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। তা-ও বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে বরাদ্দ অর্থ কেন সময়ের মধ্যে খরচ হয় না, শুক্রবার মেদিনীপুরে পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরের পর্যালোচনা বৈঠকেও সেই প্রশ্ন ওঠে। যেমন, মেদিনীপুর সদরের পাথরাগামী সেতুর কাজ ২০১৪-’১৫ সালে শুরু হয়। বৈঠকে পেশ করা রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, কাজ এগিয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। বাস্তব হল কাজ হয়েছে ৩৫-৪০ শতাংশ। ২০১৫-’১৬ সালে নয়াগ্রামের কেশরেখাগামী সেতু তৈরির কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। অথচ সদরের সেতুর ক্ষেত্রে বরাদ্দ হয়েছে ৪ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা। নয়াগ্রামের সেতুর ক্ষেত্রে বরাদ্দ হয়েছে ৪ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। অন্য দিকে, ছোট ছোট যে সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে ১-২ লক্ষ টাকা কিংবা ৪-৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে, সেগুলির কাজ প্রায় সময়ের মধ্যেই শেষ হচ্ছে।
বড় প্রকল্পের কাজগুলোর গতি যে ছোট প্রকল্পের কাজগুলোর থেকে তুলনায় কম, এ দিনের বৈঠক শেষে তা মেনেছেন পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়নমন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতোও। মন্ত্রীর যুক্তি, “বড় বড় প্রকল্পগুলো শেষ করতে একটু সময় লাগবেই। তবু আমরা দ্রুত কাজ শেষের চেষ্টা করছি!” বছর ঘুরলে বিধানসভা নির্বাচন। মুখ্যমন্ত্রী চাইছেন, এই সময় প্রশাসনিক কাজকর্মের অগ্রগতি ঘটাতে। কাজগুলো সময় মতো শেষ করতে। নির্বাচনের দিকে তাকিয়েই কি দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা? মন্ত্রীর জবাব, “নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা কোনও কাজ করি না। পশ্চিমাঞ্চল এলাকার উন্নয়নই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’’
বড় প্রকল্পের কাজ সময়ে শেষ হচ্ছে না মানলেও মন্ত্রীর দাবি, পশ্চিম মেদিনীপুরে সার্বিক ভাবে কাজের গতি ভাল। ৮০ শতাংশ ইউসি (ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট) এসে গিয়েছে। বৈঠক শেষে একই দাবি করেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তরা সিংহ। তাঁর কথায়, “পশ্চিম মেদিনীপুরে খুব ভাল কাজ হচ্ছে!”
এ দিন কালেক্টরেটের সভাকক্ষে এই বৈঠকে মন্ত্রী, জেলা সভাধিপতি ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন ব্লকের বিডিও এবং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিরা। প্রকল্পগুলো সঠিক ভাবে রূপায়িত হচ্ছে কি না, কোথাও কোনও সমস্যা দেখা দিচ্ছে কি না, সমস্যা দেখা দিলে সেগুলো কী কী, কী ভাবেই বা তার সমাধান হতে পারে, বৈঠকে সেই সব নিয়েই আলোচনা হয়।
জঙ্গলমহলের এই জেলার ‘পিছিয়ে পড়া’ এলাকার উন্নয়নে পশ্চিমাঞ্চল দফতরের একটা ভূমিকা রয়েছে। এই দফতরের বরাদ্দ অর্থে বহু কাজ হয়। পশ্চিম মেদিনীপুরের ২৯টি ব্লকের মধ্যে ১৮টি এই দফতরের বরাদ্দ করা অর্থ পায়। ঝাড়গ্রাম মহকুমার ৮টি ব্লক, মেদিনীপুর সদর মহকুমার ৬টি ব্লক এবং খড়্গপুর মহকুমার খড়্গপুর খড়্গপুর- ১, খড়্গপুর- ২, কেশিয়াড়ি এবং নারায়ণগড় এই প্রকল্পের অন্তর্গত। পশ্চিম মেদিনীপুরের জন্য বছরে প্রায় ৯ কোটি টাকা বরাদ্দও করে দফতর। প্রশাসনিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪-’১৫ সালে ৮৩টি প্রকল্পের জন্য ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। পড়ে রয়েছে ৯ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা। ইউসি এসেছে ৮ কোটি ৯০ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকার। ২০১৫-’১৬ সালে ৮০টি প্রকল্পের জন্য ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। চলতি আর্থিক বছর শেষ হতে আর প্রায় চার মাস বাকি। এখনও পর্যন্ত ৪৩টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩৭টি প্রকল্পের কাজ চলছে। পড়ে রয়েছে ৩ কোটি ৫৭ লক্ষ ১১ হাজার টাকা। ইউসি এসেছে ৫ কোটি ৪২ লক্ষ ৯০ হাজার টাকার। জেলায় বেশ কিছু প্রকল্পের গতিই শ্লথ। যেমন, গড়বেতা- ১ ব্লকের একটি রাস্তার জন্য ২৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাজ এগিয়েছে ২০ শতাংশ। গড়বেতা- ২ ব্লকের একটি জলপ্রকল্পের জন্য ২৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাজ বাকি ২০ শতাংশ। গড়বেতা- ৩ ব্লকের একটি রাস্তার জন্য ১২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাজ এগিয়েছে ৭০ শতাংশ। শালবনিতে কমিউনিটি হলের জন্য সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাজ এখনও শুরুই হয়নি। মেদিনীপুর সদরের ধেড়ুয়ার একটি সেতুর জন্য ১৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাজ বাকি ৪০ শতাংশ। শিলদা কলেজে বৈদ্যুতিক কাজের জন্য ১৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাজ এগিয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরের বরাদ্দ অর্থে জেলায় ৪২টি ‘চেক ড্যাম’ হওয়ার কথা। এর মধ্যে ২১টির এখনও প্রকল্পই চূড়ান্ত হয়নি!
কেন এখনও নয়াগ্রামের কেশরেখাগামী সেতুর কাজ শুরু হল না? জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ শৈবাল গিরির বক্তব্য, পরিকল্পনায় একটা সমস্যা ছিল। তবে তা মিটে গিয়েছে। এ বার কাজ শুরু হবে। আর মেদিনীপুর সদরের পাথরাগামী সেতুর কাজ? শৈবালবাবুর জবাব, “এই কাজ তো শেষের দিকে! ৭০- ৮০ শতাংশ হয়ে গিয়েছে! মাস চারেকের মধ্যেই শেষ হবে! কাজের অগ্রগতি নিয়ে অবশ্য সমালোচনা করতে ছাড়ছে না বিরোধীরা। জেলা কংগ্রেস সভাপতি তথা জেলা পরিষদের সদস্য বিকাশ ভুঁইয়ার কথায়, “জেলায় বিভিন্ন প্রকল্পের গতিই আশানুরূপ নয়। বরাদ্দ অর্থের একাংশ পড়েই থাকছে। সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ হচ্ছে না।’’ তাঁর কটাক্ষ, এখানে তো বিরোধিতা নেই। ২৯টি পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে ২৮টিই তৃণমূলের। একটি মাত্র কংগ্রেসের। উপরে তৃণমূল, মাঝে তৃণমূল, নীচে তৃণমূল। তাও কেন এই পরিস্থিতি হবে? মুখ্যমন্ত্রী জেলায় আসেন। তবে সেখানে নির্বাচিত বিরোধী সদস্যদের ডাকা হয় না। আরও ভাল ভাবে কাজের পর্যালোচনা হওয়া দরকার। নজরদারি বাড়ানো দরকার। না- হলে জেলার মানুষ বঞ্চিতই রয়ে যাবে!