Advertisement
E-Paper

নিষিদ্ধ শব্দবাজি তৈরি চলছেই

এ বারের কালীপুজোয় আসমান গোলা চান? শট্‌, পাইপবোমা, গাছবোমা, জলবোমা? চলে যান খড়্গপুর মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে। একটু খোঁজ করতে হবে, একটু বিশ্বাসযোগ্যতা চাই। ব্যস, ছোট ছোট চোখের ইশারায় সঠিক পথনির্দেশ আপনি পেয়ে যাবেনই।

দেবমাল্য বাগচী

শেষ আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৫ ০২:২৪

এ বারের কালীপুজোয় আসমান গোলা চান? শট্‌, পাইপবোমা, গাছবোমা, জলবোমা? চলে যান খড়্গপুর মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে। একটু খোঁজ করতে হবে, একটু বিশ্বাসযোগ্যতা চাই। ব্যস, ছোট ছোট চোখের ইশারায় সঠিক পথনির্দেশ আপনি পেয়ে যাবেনই।

বেলদার খাকুড়দা বাজারে পৌঁছে গুড়দলা যাওয়ার রাস্তার খোঁজ চলছিল। বাজারেই একটি মুদি দোকানে বসেছিল জনা তিনেক যুবক। গুড়দলার খোঁজ করতে সোজা প্রশ্ন উড়ে এল, ‘‘কেন যাবেন?’’ বাজি কথা শুনেই তাঁরা বললেন, “এখন ‘মাল’ পাবেন না।”

কেন? জানা গেল, “সকলেই কিছু না কিছু ‘মাল’ তৈরি করছেন। কিন্তু পুলিশের ভয় রয়েছে তো। আসলে পার্টিকে (রাজনৈতিক দল) ‘ফিট’ করা গেলেও পুলিশকে এ বার কোনওভাবেই রাজি হচ্ছে না। গ্রামে গিয়ে খোঁজ করুন।”

ওই যুবকের পথনির্দেশ মেনে কিছু দূর এগোনো গেল। খাকুড়দা থেকে এক কিলোমিটার গেলেই গুড়দলা মোড়। সেখান থেকে ডানদিকে গুড়দলা গ্রাম। প্রতিটি বাড়িতেই তৈরি হয় নিষিদ্ধ শব্দবাজি। গ্রামে ঢোকার মুখেই দেখা হয়ে গেল এক মহিলার সঙ্গে। বাজির কথা শুনে খুব চাপা স্বরে বললেন, “পাশের বড়মোহনপুর গ্রামে পুলিশ ঢুকেছিল। সবাই ভয়ে আছে। এ বার আমরা কেউই সে ভাবে বাজি করিনি। তবে কার্তিক দাস অধিকারীর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।” গ্রামের মোরাম রাস্তা ধরে যত এগানো যাবে ততই সঙ্কীর্ণ হবে পথ। প্রতিটি বাড়ি থেকেই সন্দেহের চোখ উঁকি দেয়। ‘‘আর কত দূরে কার্তিক দাস অধিকারীর বাড়ি’’, জিজ্ঞেস করতেই লুকিয়ে পড়ে সে সব মুখ।

গুড়দলা প্রাইমারি স্কুলের কাছেই একটি বাড়ির দাওয়ায় বসে রং-মশালের খোল বানাচ্ছিলেন বৃদ্ধ চৈতন্য মাইতি। বাইরের মানুষ দেখেই তাঁর সাফাই, “আমি খোল তৈরি করি। এখানে কিছু নেই।” কার্তিকবাবুর বাড়ির সামনেই পাওয়া গেল তাঁর স্ত্রী ডলি দাস অধিকারীকে। স্থানীয় ভাষাতেই প্রশ্ন করা গেল, ‘‘মাল’ পাওয়া যাবে?’’ উত্তর এল, “মালিক ঘরে নেই। এ সব বিষয়ে উনি বলতে পারবেন।” আর দাঁড়াতে চাইছিলেন না ডলিদেবী। তবু কী মনে হওয়ায় ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘আপনারা কোত্থেকে এসেছেন?’’ খড়্গপুরের এক ক্লাব সদস্য জেনে নিশ্চিন্ত হলেন খানিকটা। তারপর চাপা গলায় পরামর্শ দিলেন, “পাশের গ্রামে সে দিন পুলিশ এসেছিল। এখন শুনলাম গ্রামে সাংবাদিকরা ঢুকেছে। আপনারা পালিয়ে যান। পরে আসবেন।”

গ্রামের ছবি বলছে প্রায় প্রতিটি ঘরে তৈরি হচ্ছে নিষিদ্ধ শব্দবাজি। যদিও বেলদা পুলিশের দাবি, অভিযান চালিয়েও কিচ্ছু পাওয়া যায়নি। অবৈধ বাজি তৈরি বন্ধ হয়েছে বলে দাবি পুলিশ-প্রশাসনের। পিংলার ব্রাহ্মণবাড় গ্রামে গত ৬ মে এক বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল ৯ জন নাবালক-সহ ১২জনের। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, পুলিশ ও তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের মদতে ওই বাজি কারখানার আড়ালে বোমা তৈরি হত। যদিও এত মানুষের মৃত্যুর পরে মুখ্যমন্ত্রী ওই বাজি কারখানায় বিয়েবাড়ির বাজি তৈরি হচ্ছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন। উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজ্য রাজনীতি। অবশ্য এই ঘটনার পরেই সক্রিয়তা বেড়েছে পুলিশের। বিশেষত দীপাবলির আগে। কিন্তু রাজনৈতিক মদত যে অব্যহত তা স্পষ্ট খাকুড়দা বা গুড়দলাতেই।

নারায়ণগড় ব্লকের মকরামপুর থেকে কিছু দূরে কোতাইগড় গ্রামেও নিষিদ্ধ বাজির রমরমা কারবার। ওই এলাকায় প্রায় ৩-৪টি বাড়িতে তৈরি হয় অবৈধ বাজি। এলাকার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী মাধব গিরি গত ২০১৩ সালে তিন বস্তা মশলা-সহ গ্রেফতার হন। এখন তিনি জামিনে মুক্তি পান। স্থানীয়দের দাবি প্রায় ৩০জনকে কর্মীকে নিয়ে চলে তাঁর কারখানা। খড়্গপুর গ্রামীণের এক ক্লাব সদস্য পরিচয় দিয়ে ফোনে ধরা গেল তাঁকে। মাধব গিরি নিজেই বাতলে দিলেন কত টাকার বাজেটে গাছবোমা দিতে পারবেন। সেই সঙ্গে ‘শট’ শব্দবাজির খোঁজ করায় পরামর্শ দিলেন ১০০ শটের বদলে ৬০ শটের ‘মাল’ নিতে। যদিও এটুকুই যে সব নয় তাও বলে দিলেন। ‘‘ফোনে সমস্ত কিছু বলা যাবে না’’, জানালেন মাধবাবু।

ফোন করা গেল দ্বিতীয়বার। তবে এ বার সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি পরিচয় দিতেই বদলে গেল মাধব গিরির গলা, “আমি নিজে এ সব তৈরি করছি না। অন্য জায়গা থেকে জোগার করে দেব বলে বলছিলাম। তবে আমি কথা দিচ্ছি কাউকে জোগার করে দেব না।”

খড়্গপুর গ্রামীণের বারবেটিয়া থেকে জামনা যাওয়ার পথে মাওয়া, চন্দ্রি, পিংলার দুজিপুর, দাঁতনের তুরকা গ্রামের রায়পুরে দিব্যি চলছে শব্দবাজি তৈরির কাজ। তবে কাজ কমেছে অন্যান্য বারের তুলনায়। পিংলার দুজিপুরের তেগেরিয়া গ্রামের পরেশ ঘোরাই নাম করা শব্দবাজির কারবারি। ব্রাহ্মণবাড়ে মৃত রামপদ মাইতির অতি ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। তাঁর স্বীকারোক্তি “ওই ঘটনার পরে সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের চাপে আর ব্যবসা চালাতে পারছি না।” যদিও তাঁর বাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “শব্দবাজি তৈরি করছে না বললেই হল? পরেশ নাম করা ‘বান্ধার’ (বোমা বাঁধেন যিনি)। বাড়ির ভিতরে ব্যবসা চলছে। তবে আগের রমরমা নেই।”

কিন্তু কী বলছে পুলিশ? খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অভিষেক গুপ্ত বলেন, “আমরা অনেক আগে থেকেই অভিযান চালাচ্ছি। ঘাটাল, দাসপুর, ডেবরা থেকে বহু বাজি ও মশলা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। কোথাও গোপনে কারবার চালানোর কথা শুনলেই অভিযান হচ্ছে।” অবশ্য এই বিষয়ে সারা বাংলা আতসবাজি উন্নয়ন সমিতির সভাপতি বাবলা রায় বলেন, “১২৫ডেসিবেল শব্দবাজির অনুমতি থাকলেও এই রাজ্যের সরকার লাইসেন্স দিচ্ছে না। পুলিশ নিয়ম না-মেনে ব্যবসায়ীদের হেনস্থা করছে। তবে আমরাও গাছবোমা, জলবোমা, আসমানগোলার মতো শব্দবাজি সমর্থন করি না। তাছাড়াও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ির মধ্যেই বাজি তৈরি করার জন্য আমরা রাজ্যের সমস্ত বাজি ব্যবসায়ীকে অনুরোধ করছি।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy