E-Paper

‘জ্ঞানেশ-গেরো’য় হাঁসফাঁস, উদ্বেগ বাড়ছে বিজেপির

ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেওয়া বিজেপির জাতীয় আহ্বান।

সন্দীপন চক্রবর্তী, বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। —ফাইল চিত্র।

বিহারে যখন জ্ঞানেশ কুমার আচম্বিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার ঘোষণা করেছিলেন, তখন থেকে উৎসাহ-উদ্দীপনা শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের। ‘এর পরে বাংলার পালা’ বলে হুঙ্কার দিয়ে কত নাম বাদ যেতে পারে, তার ভবিষ্যদ্বাণীতে মগ্ন হয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু এখন এসআইআর-এর শুনানিতে মানুষের লাইন যত দীর্ঘ হচ্ছে, তত দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে বিজেপির! দলের অন্দরে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, জ্ঞানেশই না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ম্যাচ তুলে দিয়ে চলে যান!

ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেওয়া বিজেপির জাতীয় আহ্বান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের স্তর থেকে সেই ডাক এসে চলেছে, তাতে স্বাভাবিক ভাবেই শামিল বঙ্গ বিজেপি। রাজ্যে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে মেরুকরণের অস্ত্রে শাণ দিয়ে চলা ছাড়া বিশেষ অন্য রাস্তা বিজেপির জন্য খোলা নেই বলেই রাজনৈতিক শিবিরের বড় অংশের মত। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের মোড়কে অনুপ্রবেশ-বিরোধী জিগির সেই কৌশলেরই অঙ্গ। কিন্তু মেরুকরণের সেই হাতিয়ারও ভোঁতা হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ‘জ্ঞানেশ কমিশনে’র (এসআইআর-পর্বে বঙ্গের রাজনৈতিক শিবিরে নির্বাচন কমিশনের এমন ডাক নাম চালু হয়েছে) কাজকর্মে! দফায় দফায় ‘নো ম্যাপিং’ এবং যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) কারণ দেখিয়ে কমিশন যত মানুষকে শুনানিতে ডেকে পাঠাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে হিন্দু বাঙালির সংখ্যা বিপুল। বিধানসভা ভোটের ঠিক মুখে এই বড় অংশের মানুষের বিরক্তি ও উষ্মা উৎপাদন করে তার পরিণতি কী হবে, ভাবতে হচ্ছে বঙ্গ বিজেপিকে। দলের একাংশের মনোভাব যেন, ‘ভিখ চাই না, কুকুর সামলাও’!

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে দলের অন্য নেতারা মানুষের হয়রানির ‘বাস্তব’ মেনে নিয়েও তার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের অসহযোগিতাকেই দায়ী করছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য আবার এক ধাপ এগিয়ে বারবার আর্জি জানাচ্ছেন, ‘‘দিল্লিতে বসে থাকলে হবে না। জ্ঞানেশ কুমার রাজ্যে এসে ঘুরুন। বাসে-ট্রেনে, মেট্রোয় উঠে শুনুন, সাধারণ মানুষ কী বলছেন! জানুন পরিস্থিতি কী!’’ দলের একাংশের মত, এসআইআরের জেরে পরিস্থিতি যে দিকে মোড় নিয়েছে, সেই সংক্রান্ত হতাশা ও ক্ষোভও উঠে আসছে রাজ্য সভাপতির এই আবেদনে। রাজ্য বিজেপির আর এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘জ্ঞানেশ এবং তাঁর কমিশন যে এত অযোগ্যতা, সিদ্ধান্তহীনতা দেখাবে, ভাবা যায়নি! পশ্চিমবঙ্গের সরকার যে ভোটার তালিকা ক্রটিমুক্ত করার ক্ষেত্রে পদে পদে অসহযোগিতা করবে, জানাই ছিল। আমরা কমিশনের কাছে আগাম গিয়ে রাজ্যের পরিস্থিতি জানিয়েছিলাম। তার পরেও পুরো বিষয়টা জট পাকিয়ে যেখানে চলে গেল, তাতে সমস্যায় পড়তে হল আমাদের।’’ ওই নেতার সংযোজন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার তো ভোটে লড়বেন না !লড়তে হবে বিজেপিকে।’’

এসআইআর ঘোষণার অনেক আগেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন মাথায় রেখে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে দেখা করে রাজ্যের জন্য সাধারণ কর্মপদ্ধতি (এসওপি) বদলানোর দাবি তোলার চেষ্টা করেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। কমিশন তাঁকে তখন দেখা করার সময়ই বরাদ্দ করতে চাইছিল না। সূত্রের খবর, পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহের কাছেও পরিস্থিতি জানিয়ে রেখেছিলেন বিরোধী নেতা। কিন্তু পরিস্থিতির বদল হয়নি। এখনও শুভেন্দু বলছেন, ‘‘বাংলার মানুষ কমিশনের কাজ দেখতে চায়। ভাষণ নয়!’’

শুনানির নামে হয়রানিকে যখন কমিশন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র করে ফেলেছে তৃণমূল এবং সেই সঙ্গে সিপিএম, কংগ্রেস, তখন সাধারণ জনতার সমস্যা কমাতে কমিশনের কাছে দরবার করতেও সে ভাবে দেখা যায়নি বিজেপিকে। জাল ভোটারের নাম বাদ বা নামে আপত্তি জানানোর ফর্ম ৭ জমা দেওয়ার সময় বাড়াতে বারবার সরব হয়েছে তারা। হয়রানির ক্ষেত্রে বরং রাজ্য সরকারের কর্মচারী বিএলও, ইআরও, এইআরও-দের একাংশের ভূমিকার দিকেই বিজেপি নেতারা আঙুল তুলেছেন। বিজেপির অন্যতম সহ-সভাপতি তাপস রায়ের দাবি, ‘‘আমরা বারবার কমিশনের কাছে গিয়ে হয়রানি কমানোর দাবি করেছি। আমরা কেন চাইব সাধারণ মানুষের হয়রানি হোক? কিন্তু এই হয়রানি কাদের জন্য হচ্ছে? রাজ্য সরকারের কর্মচারী, কিছু তৃণমূলপন্থী বিএলও-দের ভুলের মাসুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।’’ আবার রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিত সরকারের যুক্তি, ‘‘বিজেপি যা দাবি করছে, সেটা মানুষের হয়রানি কমানোর জন্যই। দিনের পর দিন যারা অবৈধ ভাবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জমি, বাড়ি, চাকরি, রেশনের উপরে ভাগ বসিয়েছে, তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। ক্যান্সার হলে জীবন বাঁচানোর জন্য কেমো নিতে হয়। আর কেমো নিলে শরীরে যন্ত্রণা, শারীরিক কিছু বিকৃতি আসে। জীবন বাঁচানোর স্বার্থে সেগুলো মেনে নিতে হয়!’’

রাজ্যে শেয পর্যন্ত কত ভোটারের নাম কাটা গেল, স্পষ্ট হবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হলে। রাজনৈতিক শিবিরের বড় অংশের ধারণা, ষথেচ্ছ ভাবে নাম বাদ গেলে ফের আদালতে বিষয়টা গড়াবে। আর যাঁর নাম বাদ পড়বে, তাঁর পরিবার বিজেপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। আপাতত গেরোয় পড়েছে বিজেপিই!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Election Commission of India ECI

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy