E-Paper

পাছে নাম বাদ যায়! ফিরছেন পরিযায়ীরা

মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার আসানপাড়ার বাসিন্দা এন্টু শেখ ১২ জানুয়ারি চেন্নাইয়ে রাজমিস্ত্রির কাজে গিয়েছিলেন।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৪
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

চিকিৎসা, লেখাপড়া এবং কাজের সূত্রে যাঁরা বাইরে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের শুনানিতে তাঁদের বদলে নিকটাত্মীয়দের উপযুক্ত নথি-সহ হাজিরায় অনুমতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সেই সুবিধা পাওয়ার কথা পরিযায়ী শ্রমিকদেরও। কিন্তু, এখন উত্তর থেকে দক্ষিণ—যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি বা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির আওতায় পড়ে বহু পরিযায়ী শ্রমিক শুনানিতে ডাক পাচ্ছেন। নিকটাত্মীয়ের ভরসায় অনেকে কর্মক্ষেত্রে থেকে গেলেও অনেকে আতঙ্কে ছুটে আসছেন বা আসতে বাধ্য হচ্ছেন নিজের কাজ-রোজগার ফেলেই।

যেমন বীরভূমের দুবরাজপুরের ১৩৯ পার্টের ভোটার বিষ্ণু বাউড়ি। নোটিস পেয়ে তাঁকে ছুটে আসতে হয়েছে চেন্নাই থেকে। পেশায় নির্মাণ শ্রমিক বিষ্ণু বিয়ে করেননি। বাবা-মাও বেঁচে নেই। ফলে, তাঁর হয়ে শুনানিতে যাওয়ার কেউ নেই। আজ, মঙ্গলবার শুনানি। বিষ্ণুর কথায়, ‘‘আচমকা এ ভাবে আসায় টাকা ও সময়, দুটোই নষ্ট হল। শুনানিতে কী বলে দেখি।’’ একই ভাবে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির আওতায় পড়ে শুনানিতে ডাক পেয়ে দুবাই থেকে বীরভূমের নানুরের গোপালনগর গ্রামে, নিজের বাড়িতে চলে এসেছেন উৎপল হাজরা। দুবাই থেকে গ্রামে ফিরতে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু, পাছে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যায়, তাই কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি উৎপল।

মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার আসানপাড়ার বাসিন্দা এন্টু শেখ ১২ জানুয়ারি চেন্নাইয়ে রাজমিস্ত্রির কাজে গিয়েছিলেন। নোটিস পেয়েছেন তিনিও। শেষ মুহূর্তে ট্রেনের সংরক্ষিত আসনের টিকিট না পেয়ে সাধারণ কামরায় চেন্নাই থেকে কার্যত দাঁড়িয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরেছেন। এন্টু বলেন, ‘‘এসআইআরের ফর্ম পূরণের সময় আমি ঝাড়খণ্ডে কাজে গিয়েছিলাম। সেই সময় আমার বোন ফর্ম পূরণ করে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিএলও ফোন করে আমাকে ডেকে পাঠালে আমি ভোটার কার্ড, আধার কার্ড-সহ সব নথি জমা দিই। কিন্তু, ২৪ জানুয়ারি ফের শুনানির নোটিস এসেছে। তাই পড়িমড়ি করে কাজ ফেলে গ্রামে ফিরতে হল।’’

গুজরাতের সুরাতে সেলাইয়ের কাজ করেন উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁর ২৩৪ নম্বর বুথের বাসিন্দা মিজানুর গাজি। তাঁর ক্ষোভ, ‘‘দশ দিনে দু’বার নোটিস পেয়ে, বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে এলাকায় ফিরতে হল। ট্রেনের টিকিট নেই, বেশি টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে তো হলই, সঙ্গে ছুটির জন্য মজুরির টাকাও কাটা গেল।’’

পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী ২ ব্লকের ঝাউডাঙা এলাকা থেকে অনেকে ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যান। তাঁদেরই এক জন, বাবু দে রাজস্থানের জয়পুরে গয়না তৈরির কাজ করেন। বছর চল্লিশের বাবু বলছেন, ‘‘শুনানির চিঠি আসার কথা জেনে দ্রুত স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছি। শুনানি হয়েও গিয়েছে। তবে, ভোটার তালিকায় নিজের নাম দেখে তবেই জয়পুরে ফিরব।’’ তাঁর দাবি, এই ক’দিনের রোজগার মার গেল। তাঁর কথায়, ‘‘তবে ভোটার তালিকায় নাম থাকাটা জরুরি। তাই তালিকা না দেখা পর্যন্ত নড়ছি না।’’

পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের বাসিন্দা সন্দীপ ভৌমিকও কর্মসূত্রে দুবাইয়ে থাকেন। শুনানিতে ডাক পাওয়ার পরে প্রথমে সন্দীপের বাবা গিয়েছিলেন ব্লক অফিসে। কাজ হয়নি। শেষে দুবাই থেকে এসে শুনানিতে অংশ নেন সন্দীপ। রবিবার ফের দুবাই ফিরেছেন। সন্দীপের বাবা জগন্মোহন বলছিলেন, ‘‘এত কাজের চাপ। শুনানি শেষ করেই ফিরে গেল। যাতায়াতের খরচও অনেক। এটা বাড়তি হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়।’’

পরিযায়ী শ্রমিকদের একাংশের ক্ষোভ, ‘‘বার বার নোটিস আসবে, ডেকে পাঠাবে, আর আমাদের সব কাজ ফেলে পৌঁছে যেতে হবে। কমিশন কি ভেবে দেখেছে, আমরা এত কম সময়ে পৌঁছব কী করে! এক দিনের মজুরিও যে আমাদের জন্য অনেক!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

migrant labour

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy