Advertisement
E-Paper

মমতার আপত্তি উড়িয়ে একশো দিনের মজুরি আসবে ব্যাঙ্কেই

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি সত্ত্বেও একশো দিনের কাজের টাকা সরাসরি শ্রমিক তথা উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই পাঠাতে চায় কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে গত শুক্রবার লেখা চিঠিতে একশো দিনের কাজ প্রকল্পে কেন্দ্রের টাকা দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।

শঙ্খদীপ দাস

শেষ আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০১৬ ০৩:১৯
—ফাইল চিত্র।

—ফাইল চিত্র।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি সত্ত্বেও একশো দিনের কাজের টাকা সরাসরি শ্রমিক তথা উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই পাঠাতে চায় কেন্দ্র।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে গত শুক্রবার লেখা চিঠিতে একশো দিনের কাজ প্রকল্পে কেন্দ্রের টাকা দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, এ ভাবে রাজ্য সরকারকে এড়িয়ে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো লঙ্ঘন করছে মোদী সরকার। কিন্তু মমতার চিঠির পরেও কেন্দ্র এ ব্যাপারে প্রক্রিয়াগত কোনও পরিবর্তন ঘটাতে নারাজ। বরং গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের শীর্ষ কর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন, কেন্দ্র কোনও ভাবেই রাজ্যকে এড়িয়ে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর শর্তও লঙ্ঘন করা হচ্ছে না। একশো দিনের কাজ প্রকল্পে মজুরির টাকা সরাসরি শ্রমিক তথা উপভোক্তাদের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একেবারেই প্রশাসনিক যুক্তিতে। এর মধ্যে কোনও রাজনীতি নেই।

মোদী সরকারের মতে, সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মজুরির টাকা পৌঁছে দেওয়ার পিছনে তিনটি মৌলিক কারণ রয়েছে। এক, মজুরির টাকা যেন শ্রমিকরা তাড়াতাড়ি পান। দুই, প্রকল্প খাতে খরচের প্রক্রিয়ায় যেন স্বচ্ছতা থাকে। এবং তিন, সরকারের অর্থের অপচয় যাতে না হয়। মমতা যে এই পদ্ধতিগত দিকটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে লাগাতার কেন্দ্রবিরোধী আক্রমণ শানাচ্ছেন, তা প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের নজরে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে আলোচনাও হয়েছে। ওই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের সচিব অমরজিৎ সিন্হা।

Advertisement

পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগগুলি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে গ্রামোন্নয়ন সচিব বলেন, ‘‘রাজ্যকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্নটি অবান্তর। কারণ, জেলায় জেলায় গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিই ঠিক করছে তাদের এলাকায় কী ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। তার পর গ্রাম পঞ্চায়েতে নিযুক্ত রাজ্য সরকারের ইঞ্জিনিয়ার কাজের সবিস্তার বহর স্থির করছেন এবং তহবিল হস্তান্তরের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ রাজ্যই পুরো ব্যাপারটি চালাচ্ছে, কেন্দ্র নয়। কারা কাজ করছেন, কাদের মজুরি প্রাপ্য, সেটাও ঠিক করছে রাজ্যই। কেন্দ্র শুধু মজুরির টাকা সরাসরি উপভোক্তা তথা শ্রমিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দিচ্ছে।’’

প্রসঙ্গত, একশো দিনের কাজের মজুরি বাবদ খরচের ষোলো আনাই দেয় কেন্দ্র। প্রকল্পের জন্য উপকরণ বা মালমশলা বাবদ যে খরচ হয়, তার ৭৫ শতাংশ দেয় কেন্দ্র, ২৫ শতাংশ দেয় রাজ্য। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন সচিবের বক্তব্য, ২০০৬ সালে প্রথম ইউপিএ জমানায় প্রকল্পটি যখন শুরু হয় তখন এ বাবদ তহবিল পাঠানো হত রাজ্যের অর্থ দফতরের কাছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা হল, অর্থ দফতর ঘুরে প্রকল্প বাবদ টাকা জেলায় পৌঁছতে নানা প্রশাসনিক কারণে দেরি হচ্ছিল। অথচ নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনও শ্রমিক কাজ করার ১৫ দিনের মধ্যে মজুরির টাকা তাঁর হাতে তুলে দিতে কেন্দ্র দায়বদ্ধ। তাই সময় বাঁচাতে সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে সময় বাঁচানোই যে একমাত্র কারণ নয়, তা-ও জানান সচিব। একশো দিনের কাজ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার ছ’মাসের মধ্যেই একের পর এক রাজ্য থেকে এ ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ আসতে শুরু করেছিল গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকে। তখন কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী ছিলেন আরজেডি নেতা রঘুবংশ প্রসাদ সিংহ। শ্রমিকদের ভুয়ো তালিকা তৈরি করে টাকা তুলে নেওয়ার হাজার হাজার অভিযোগ আসে তাঁর নিজের রাজ্য বিহার থেকেও। তাই উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যাপারে রঘুবংশই প্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন। মোদী সরকারের বক্তব্য, ইউপিএ আমলের সেই উদ্যোগকেই তারা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন সচিবের কথায়, ‘‘প্রকল্পে অর্থ অপচয়ের অনেক ছিদ্রপথ ছিল। সেগুলি অবশ্যই বন্ধ করা জরুরি।’’ তিনি জানান, একশো দিনের কাজ প্রকল্পে শ্রমিকদের আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করার পথেও অনেকটা এগিয়েছে কেন্দ্র। প্রকল্পের আওতায় দেশে যত শ্রমিক কাজ করেন, তাঁদের ৭৭ শতাংশ তথা সাড়ে আট কোটি শ্রমিককে এখন আধার কার্ডের ভিত্তিতে মজুরি দেওয়া হয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য শুধু মজুরি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলেননি। প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে তিনি এই অভিযোগও করেছেন যে, প্রকল্প বাবদ সময় মতো বরাদ্দ দিচ্ছে না কেন্দ্র। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন সচিব জানান, একশো দিনের কাজ-সহ গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পগুলির অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেছিলেন তিনি। মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েত দফতরের কর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকও করেছিলেন। অমরজিতের দাবি, ‘‘শুধু এই প্রকল্প নয়, পেনশন প্রকল্প, জাতীয় আবাস যোজনা, গ্রামীণ স্বাস্থ্য যোজনা, জীবিকা প্রকল্প, গ্রাম সড়ক যোজনা— সব খাতেই রাজ্যকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এবং রাজ্যের কাছে এ সব প্রকল্প বাবদ কেন্দ্রের বরাদ্দ করা অব্যবহৃত অর্থও রয়েছে। গত এবং চলতি আর্থিক বছরে গোটা দেশে একশো দিনের কাজ প্রকল্পে যত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, তার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ দেওয়া হয়েছে পশ্চিমবঙ্গকে। কারণ, বাংলায় কাজের চাহিদাও বেশি।’’ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরে একশো দিনের কাজ প্রকল্পে কেন্দ্র এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের জন্য ৩৯৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বাবদ দেওয়া হয়েছে ৩৪৭৬ কোটি টাকা।

আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করা নিয়েও আপত্তি করেছিলেন মমতা। কিন্তু গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের কর্তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই প্রকল্পে উপভোক্তাদের আধার কার্ড থাকাটা ক্রমে বাধ্যতামূলক করার পথেই হাঁটতে চলেছেন তাঁরা।

hundred days of work Narendra Modi Mamata Banerjee
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy