তারা আইন বোঝে না। আইন তো দূর, তারা তো এ-ও বোঝে না, যে তাদের মা আর বেঁচে নেই!
দুধের সেই শিশু দু’টির ঠিকানা সোমবার থেকেই ‘কেয়ার অব জেল’! আড়াই বছর ও ন’মাসের দুই মেয়ে পুরুলিয়া জেলা সংশোধনাগারে থাকবে তাঁদের সঙ্গেই, যাঁরা তাদের মাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত।
বছর পাঁচেক আগে ঝাড়খণ্ডের রামগড় জেলার নরসিংহডি গ্রামের গীতা নায়কের (২২) সঙ্গে বিয়ে হয় পুরুলিয়ার ঝালদা থানার চৌপদ গ্রামের বাসিন্দা সুনীল নায়কের। চলতি ৭ মে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান গীতা। পর দিন সন্ধ্যায় এলাকায় জারা নদীর কাছে জঙ্গলে গাছে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মেলে। গীতার মা সরুনা নায়ক পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, পরপর দু’টি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে শ্বশুরবাড়ির গঞ্জনা ও নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁর মেয়ে। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মৃতার স্বামী সুনীল, শ্বশুর মনসু ও শাশুড়ি শেফালিকে রবিবার গ্রেফতার করে।
সোমবার ধৃতদের পুরুলিয়া আদালতে হাজির করায় পুলিশ। পুরুলিয়ার মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট সন্তোষকুমার পাঠক ধৃতদের ১৪ দিন জেল হাজতে রাখার নির্দেশ দেন। তাঁদের সঙ্গেই গীতার দুই শিশুকন্যাকেও সংশোধানাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। প্রশ্ন উঠেছে, লৌহকপাটের অন্দরে ওই দুই মেয়ে তাদেরই মায়ের মৃত্যুতে অভিযুক্ত বাবা-ঠাকুরদা-ঠাকুমার সঙ্গে কি আদৌ সুরক্ষিত? শিশুকন্যাদের সরকারি হোমে রাখার ব্যাপারে কেন আবেদন জানালেন না, সে প্রশ্নে সরকারি আইনজীবী অরুণ মজুমদার বলেন, ‘‘অভিযুক্তদের হয়ে কেউ জামিনের আবেদন জানাননি। তা ছাড়া, সোমবার প্রচুর মামলার মধ্যে বিষয়টা খেয়াল ছিল না।’’
মৃত বধূর বাপেরও বাড়িও মেয়ে দু’টিকে নিজেদের কাছে রাখতে চায়নি। গীতার বোনপো মনসারাম গরাইয়ের বক্তব্য, ‘‘আমাদের কাছে থাকাকালীন ওদের কিছু হলে মাসির শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমাদেরই দায়ী করত। তাই আমরা রাখতে চাইনি।’’ জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টে (সংশোধিত ২০০৬) বলা হয়েছে, কোনও ‘বাচ্চা’-কেই (আঠারোর নীচে) জেল হেফাজতে রাখা যায় না। জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের প্রাক্তন সদস্য কুণাল দে বলেন, ‘‘এ ক্ষেত্রে ওই শিশু দু’টি পরিস্থিতির শিকার। কার কাছে তারা নিরাপদে থাকবে, তা খুঁজে দেখার ভার জেলা শিশুকল্যাণ কমিটির। তারা খুঁজে দেখবে, বাচ্চারা কার বা কাদের কাছে থাকতে চাইছে। বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন এক প্রবেশন অফিসার।’’
আশার কথা, মঙ্গলবার পুলিশ অতিরিক্ত জেলাশাসকের কাছে ওই দুই শিশুকে সংশোধনাগারের পরিবেশের বদলে আরও ভাল পরিবেশে রাখার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে। অতিরিক্ত জেলাশাসক বিষয়টি মহকুমাশাসকের কাছে পাঠান। মহকুমাশাসক (পুরুলিয়া পশ্চিম) সুমনা মণ্ডল বলেন, ‘‘আবেদন এসেছে। আমি খতিয়ে দেখি, এই বিষয়টি আমার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে কিনা।’’
জেলা চাইল্ড লাইনের কো-অর্ডিনেটর দীপঙ্কর মজুমদারের কথায়, ‘‘শুনেছি, ওই শিশুদের মামাবাড়ির লোকজনও তাদের নিতে চায়নি। এই অবস্থায় ওরা যাতে আরও ভাল পরিবেশে থাকতে
পারে, তার জন্য পুলিশ আবেদন জানাতেই পারে।’’