কে বলবে বেলা দশটা। প্রায় খা খা করছে বাজার। হাতে গোণা কয়েক জন তখনও সব্জির ঝুড়ি নিয়ে বেজার মুখে বসে। ছোট মাছ নেই বললেই চলে। থাকলেও হয় ভাল না, নয় চড়া দাম। বিক্রিবাট্টাও তেমন নেই। দোকানির স্পষ্ট কথা, ‘‘আর মাছ নিয়ে বসব না।’’ মাংস? নাহ্, সহজে ও মুখো হচ্ছেন না কেউ-ই।
বাজারের এ হেন ছবির কারণ একটাই। এই গরমে ঘড়ির কাটা ৬টা ছোঁয়ারও অপেক্ষা করছেন না কেউ। সাতসকালে হাতে ঝোলা নিয়ে বাজারে হাজির। এক দিনেই পারলে সাত দিনের বাজার তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা। যাতে ঘামে ভেজা সপসপে পাঞ্জাবি গায়ে বেশ কিছু দিন আর ও-মুখো হতে না হয়।
শুধু রোদ-গরমেই নয়, বাজারের এ হেন মন্দায় কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে ব্যবসায়ীদের। লাউ-পেঁপে-ঝিঙে, এ সব নিয়ে বসছেন যাঁরা, তাঁদের বাজার নেহাত খারাপ নয়। ফলের মধ্যে কাচা-মিঠে আম, তরমুজ বিক্রেতাদের বেচাকেনা ভালই। কিন্তু মাছ-মাংস বিক্রিতে খুবই মন্দা।
এ দিকে বাজারের কাছেই ঠান্ডা পানীয় কিংবা আইসক্রিমের দোকানে রমরমা। বিক্রি বেড়ে এসি-ফ্রিজেরও। যাঁদের এসি কেনার সাধ্য নেই, তাঁরা স্ট্যান্ড ফ্যান কিনছেন।
তবে কেনাকাটা যা-ই হোক, সম্ভব হলে দিনের বেলাটা এড়িয়ে যাচ্ছেন সকলে। সন্ধ্যে নামলে গুটি গুটি পায়ে ঘুরে আসছেন বাজার। ফলে বহু ক্ষেত্রে দোকানিরাও রুটিন বদলেছেন। দুপুরে তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে রোদ পড়লে দোকান খুলছেন। ঝাঁপ ফেলছেন না অনেক রাত পর্যন্ত।
কৃষ্ণনগর শহরের হাইস্ট্রিটের কাপড়ের দোকানের মালিক সঞ্জয় সিংহ যেমন বললেন, “রোদ-গরমের প্রভাব কিছুটা হলেও ব্যবসার ওপরে পড়েছে। ফলে আমরা ক্রেতাদের সুবিধার জন্য সকালের দিকে এক ঘণ্টা আগেই দোকান খুলছি। রাতেও এক ঘন্টা দেরিতে দোকান বন্ধ করছি।” তাঁর বক্তব্য, যে হেতু এখন বিয়ের মরশুম চলছে, তাই বিক্রিবাট্টা বন্ধ নেই। কিন্তু অনেকেই চাঁদিফাটা রোদ্দুর এড়িয়ে সন্ধ্যার পরে বাজার করতে আসছেন।
বাইরের রোদ-গরম থেকে কিছুটা বাঁচতে দোকানের সামনে বড় পর্দা ঝুলিয়ে রেখেছেন মালিক কৃষ্ণেন্দু বিশ্বাস। নিজে দোকানের ভেতরে ফ্যানের তলায় চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে ঝিমোচ্ছিলেন। পোস্টঅফিস মোড়ের বস্ত্রব্যবসায়ী কৃষ্ণেন্দুবাবু জানালেন, —‘‘আর বলবেন না। গরমের জন্য লোকজন দিনের বেলায় বাজারে আসতে চাইছেন না। যা ব্যবসা হওয়ার সন্ধ্যার পরে হচ্ছে।”
বহরমপুরের খাগড়ার নামি বস্ত্র বিপণির ম্যানেজার শান্তনু দাস জানালেন, বিয়ের বাজার। কিন্তু ওই পর্যন্তই। বিয়ে উপলক্ষে যেটুকু শাড়ি-জামাকাপড় বিক্রি হচ্ছে তাই। নইলে লোকে সুতির পোশাক ছাড়া অন্য কিছু কিনছেন না।
কৃষ্ণনগরের চ্যালেঞ্জ মোড়ের এসি ও ফ্রীজ ব্যবসায়ী উৎপল তলাপাত্র বলেন, “অত্যাধিক গরমের জন্য ফ্রিজ ও এসি-র ভাল চাহিদা রয়েছে। এসি বিক্রির পরিমাণ অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে।” তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের এখান থেকে প্রতি দিন গড়ে পাইকারি ও খুচরো মিলে ৩০টি ফ্রিজ ও ১০-১২টি এসি বিক্রি হচ্ছে।’’ শুধুই কি রোদ-গরমে বিক্রি বাড়ছে? উৎপলবাবুর দাবি, “এটা একটা অন্যতম কারণ। তবে এ সময়ে কোম্পানিগুলি নানা রকম অফার দেয়।” শহরের অপর এসি ও ফ্রিজ ব্যবসায়ি প্রদীপ দে বলেন, “গরমকালেই তো আমাদের ব্যবসার সময়। ফলে এই সময়ে এসি ফ্রিজ বিক্রি বাড়ে। এ বারেও বাজার ভাল।”
একই বক্তব্য বহরমপুরের কাদাইয়ের ব্যবসায়ী বিমান চৌধুরীর। বলছেন, ‘‘কুলারের চাহিদা মারাত্মক। গোডাউনে ঢোকাতে পারছি না, তার আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।’’ আর এক দোকানি নিতাই বসাকের কথায়, ‘‘গত মাসে ৩০০ কুলার বিক্রি হয়েছে। ফ্রিজ বিকিয়েছে ৬০০টা।’’ গরমের ধাক্কায় কপালে হাত পড়েছে চা ব্যবসায়ীরও। এমনই এক জন গোপাল কুণ্ডু বললেন, ‘‘ভোর ভোর দোকান খুলতে হচ্ছে। আর বেলা বাড়তেই খরিদ্দার উধাও। লক্ষ্মীর দেখা আবার সেই সন্ধ্যায়। কবে যে বৃষ্টি আসবে...।’’
শুনে মুচকি হাসলেন আইসক্রিমের ব্যাপারি। একেই তো বলে— ‘‘কারও পৌষ মাস, আর কারও...।’’
সহ প্রতিবেদন: শুভাশিস সৈয়দ