সপ্তাহখানেক পরেই ছিল পরীক্ষা। তার আগে জেএনএম (জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের জুনিয়র বয়েজ হস্টেলের বন্ধ ঘর থেকে উদ্ধার হল এক ডাক্তারি পড়ুয়ার পচাগলা দেহ। শুক্রবার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে কল্যাণী শিল্পাঞ্চল এলাকায়। মৃত ছাত্রের নাম পুলক দাস। তাঁর বয়স ২১ বছর। তিনি কলেজের তৃতীয় বর্ষের পড়ুয়া ছিলেন। তাঁর বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার এলাকায়। মৃতদেহে পচন ধরায় হস্টেলের নিরাপত্তা এবং কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সহপাঠীরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে হস্টেলের একটি ঘর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। সন্দেহ হওয়ায় আবাসিকেরা গিয়ে দেখেন, পুলকের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। খবর দেওয়া হয় কলেজ কর্তৃপক্ষ ও কল্যাণী থানায়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ওই ছাত্রের পচাগলা দেহ উদ্ধার করে।
সহপাঠীদের দাবি, গত তিন দিন ধরে পুলকের সঙ্গে তাঁদের কোনও যোগাযোগ ছিল না। শেষ কথা হয়েছিল প্রায় ৭২ ঘণ্টা আগে। দেহটিতে পচন ধরায় অনুমান করা হচ্ছে, অন্তত দু’-তিন দিন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঘরটিতে পুলক একাই থাকতেন বলে জানা গিয়েছে।
এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হস্টেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন জুনিয়র বয়েজ হস্টেলের আবাসিকেরা। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি গাইডলাইন থাকা সত্ত্বেও হস্টেলের প্রতিটি ফ্লোরে এখনও সিসি ক্যামেরা বসানো হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আবাসিক বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি দিন হস্টেল সুপারের পরিদর্শন করার কথা। সিসি ক্যামেরা পর্যন্ত নেই। বাইরে থেকে যে কেউ অনায়াসে হস্টেলে ঢুকতে পারে। এমনকি, এক জন ছাত্র ঘরে একা কেন থাকছিলেন, সেই উত্তরও কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।” ছাত্রদের একাংশের অভিযোগ, খুনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কোনও আততায়ী বাইরে থেকে এসে এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
আরও পড়ুন:
ছাত্রদের এই অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। হস্টেল সুপার সৌরজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “হস্টেল সমস্ত নিয়ম মেনেই চলে। তবে কারও ব্যক্তিগত পরিসরে বা ঘরের ভিতরে হস্তক্ষেপ করা কর্তৃপক্ষের এক্তিয়ারভুক্ত নয়।” কলেজের অধ্যক্ষ মণিদীপ পাল বলেন, “পুরো বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে দেখছে, এর বেশি কিছু এখন বলা সম্ভব নয়।”
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে মৃতদেহে কোনও আঘাত বা কাটাছেঁড়ার চিহ্ন মেলেনি। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে দেহটি ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। হৃদ্রোগ নাকি অন্য কোনও অসুস্থতা, তা রিপোর্ট এলেই স্পষ্ট হবে। তবে খুনের তত্ত্বও একেবারে নাকচ করছে না পুলিশ। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক জন সহপাঠীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং মৃতের পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে।
রানাঘাট পুলিশ জেলার সুপার আশিস মৌর্য বলেন, ‘‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছোয়। দেহটি পচন ধরতে শুরু করেছিল। সেই অবস্থাতেই উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক ভাবে দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি। ময়নাতদন্তের জন্য দেহটি হাসপাতালে পাঠিয়েছে পুলিশ। বেশ কয়েক জন সহপাঠীকে ইতিমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে যেটুকু জানা গিয়েছে, ওই ছাত্রের সঙ্গে তাঁর সহপাঠীদের প্রায় ৭২ ঘণ্টার আগে শেষ বারের মতো কথা হয়েছিল। তবে কোনও সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে তদন্ত চলছে।’’
একটি সূত্রের দাবি, আরজি কর আন্দোলনের সময়ে সেই আন্দোলনের বিরোধিতা করে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট (ডব্লিউবিজেডিএফ)-এর ‘দাদাগিরি’র শিকার হয়েছিলেন পুলক। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফেল করিয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। তাঁর দেহ উদ্ধারের পরে হাসপাতাল চত্বরে অনেক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।