গ্রামের স্কুলে তেমন পড়াশোনা হয়নি। প্রাথামিক স্তর উত্তীর্ণ হতে সংসারের প্রয়োজনে মাঠে মাটি কাটার কাজ করতে হয়। সংসারে অভাব ছিল। পরিবারে আমরা আট জন। তাই কাজ খুঁজতে যেতে হয় ভিন্ রাজ্যে। উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে চুল কেনা ও বিক্রির কাজ করছিলাম। লকডাউনের কথা প্রথমে শুনিনি। অনেক পরে আমাদের কানে পৌঁছলেও সেটা অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। পুরো বিষয় বোঝার পরে বুঝতে পারি সব পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ। ট্রেন, বাস চলছে না। ফলে বাড়ি ফেরা যাবে না।
কিন্তু এ ভাবে তো থাকাও যায় না। তাই এক সঙ্গে ১২ জন নানা ভাবে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করি। কিন্তু কোনও ভাবে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করতে পারিনি। তার মধ্যে রোজগার বন্ধ হয়েছে আগেই। হাতের জমানো টাকাও শেষ। আজ এক সঙ্গীর সাহায্য নিয়ে চলি কাল অন্যের। এই ভাবে চলছিল। কিন্তু সেটাও এক সময় বন্ধ হয়ে যায়।
তাই কয়েক জন মিলে সিদ্ধান্ত হয় সাইকেলে করে বাড়ি ফেরার। চুল ফেরি করার সাইকেল সঙ্গেই ছিল সেটাকে সম্বল করে যাত্রা। সকলেই সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে চুলের ফেরি করে। আমরা সকলে গাজিপুরে থাকলেও বারাণসীতে চুল ফেরির কাজ করি। সকলেই সেই পুরনো সাইকেলে করেই সুদূর উত্তরপ্রদেশের বারাণসী থেকে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। প্রায় ৭০০ কিলোমিটার সাইকেল যাত্রা। রাস্তায় পুলিশ থাকলেও আমাদের কিছু বলেনি। পুলিশের ভয়ে আমরা সকলে প্রধান রাস্তা বাদ দিয়ে অন্য রাস্তা ধরি। তবে সঙ্গে তেমন খাবার ছিল না। চিন্তা ছিল, আমাদের সঙ্গে যে ১২ জন ছিল, তাঁদের কয়েক জন এতটা রাস্তা সাইকেলে করে যেতে গিয়ে অসুস্থ না হয়ে পড়ে। আমারও শরীর ভাল ছিল না। কোমর ও পায়ে তীব্র যন্ত্রণা। তার মধ্যে ওই সাইকেলও বিগড়ে যায়। কিন্তু বাড়ি ফিরতে হবে। সেই সাইকেল কোনও রকমে মেরামত করি।
বারাণসী থেকে জিটি রোড লাগোয়া রাস্তা ধরি। জিটি রোড ধরে অনেক যাওয়ার পর আসানসোল। বর্ধমান থেকে কান্দি হয়ে বহরমপুরের গঙ্গা পাড় হয়েছিলাম। সেখান থেকে বেলডাঙা। আমরা একটা শনিবার বারাণসী থেকে সাইকেলে করে বেরিয়েছি। এখানে পৌঁছেছি মঙ্গলবার। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা এক সঙ্গে বাড়ি ফিরতে পারেনি। তাঁরা বিভিন্ন ভাবে এসেছেন। কেউ রাস্তায় গাড়িতে সাইকেল তুলে অর্ধেক পথ এসেছেন। তবে আমি সাইকেলে করে পুরো পথ অতিক্রম করেছি। একটা মন্দিরের সামনের অংশে কিছু সময় রাতের বিশ্রাম নিয়েছি। সামান্য শুকনো খাবার ছিল সেই খাবার খেয়েছি। তবে একদিন খাবার জোটেনি। জল খেয়েছি।