শহরে তিনি ফিরছেন। অনেক বছর বাদে। আর তাঁর সেই ‘ফেরা’ দেখতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নবদ্বীপ।
এই নাট্যমোদী নবদ্বীপকে কতদিন বাদে দেখছেন, প্রবীণেরাও তা মনে করতে পারছেন না। কিন্তু উৎসাহটা কি শুধু নাটক নিয়েই? যদি তা-ই হবে, তা হলে কিছু দিন আগেই দেবশঙ্কর হালদারের মতো নটের অভিনয় দেখতে শহর হল ভরাল না কেন?
কথা ছিল রবিবার সন্ধ্যা থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও দেবশঙ্কর হালদার অভিনীত ‘ফেরা’ নাটকের প্রবেশপত্র পাওয়া যাবে শহরের রবীন্দ্র সংস্কৃতি মঞ্চের সামনে রাস্তার ধারের অস্থায়ী কাউন্টারে। সেই মতো শহর জুড়ে মাইকে প্রচারও হয়েছিল আগে কয়েকদিন। কিন্তু তার ফল যে এমন হবে কে জানত! রবিবার কাউন্টার খোলার ঘণ্টা দুয়েক আগেই এক-দুই করে জমতে শুরু করে টিকিট প্রত্যাশী দর্শকের ভিড়টা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভিড়ের চেহারা দেখে টিকিট কাটতে আসা এক নাট্যকর্মী কাঞ্চন দত্ত নিজেই কাগজ পেন নিয়ে কে কখন এসেছেন তার একটা তালিকা তৈরি করে ফেলেন। কাউন্টার খুললে সেই মতো টিকিট পাবেন।
উদ্যোক্তারা যখন সেখানে পৌঁছন ততক্ষণে কে আগে কে পরে তা নিয়ে রীতিমতো বিতণ্ডা শুরু হয়ে গিয়েছে। শহরের প্রবীণ নাট্যরসিক স্বপন সিংহ রায়ের অভিযোগ, তিনি এসেছেন সবার আগে, সেই চারটের সময়। অথচ কাগজে যে তালিকা তৈরি হল তাতে তিনি পিছিয়ে গেলেন।”
ইতিমধ্যে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে অস্থায়ী কাউন্টার খুলে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পরে বড়জোর ঘণ্টা খানেক কেটেছে। ভিড় হালকা। কাউন্টারে বসা উদ্যোক্তারা নিজেরাই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, ব্যাপারটা ঠিক কী হল। মোট টিকিটের প্রায় ৬৫ ভাগ টিকিট কার্যত ঝড়ের গতিতে উড়ে গেল। প্রায় ৯৬ হাজার টাকার টিকিট প্রথম দিনে বিক্রি হয়ে গিয়েছে।
উদ্যোক্তাদের তরফে অঞ্জন চতুর্বেদী এবং তপন রাঢ়ী বলছেন “কাগজেই পড়েছি এ বার শীতে কল্যাণীতে একদিনে সোয়া চার লক্ষ টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছিল কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের উৎসবে। কিন্তু তা বলে আমাদের এখানেও এমন একটা ব্যাপার যে ঘটতে পারে আমরা বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারিনি।”
সোমবার দ্বিতীয় দিনে বিক্রি হয়ে যায় সাড়ে চব্বিশ হাজার টাকার টিকিট। মঙ্গলবার তৃতীয় দিনে বিক্রির পরিমাণ সাড়ে দশ হাজার টাকা। মঙ্গলবার কাউন্টার বন্ধ করে তপনবাবু বলেন, “মোট সাড়ে আটশো টিকিটের মধ্যে পড়ে আছে ব্যালকনির মাত্র ৪১টি টিকিট। এই কয়েকটি টিকিট দিয়ে কার মুখরক্ষা করতে পারব জানি না।” যাদের যৌথ উদ্যোগে আগামী ২৯ মার্চ নবদ্বীপে মুখোমুখি ‘ফেরা’ নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে সেই ‘সমস্বর’ এবং ‘ইনফরমেশন’-এর কেউই বুঝতে পারেননি ব্যাপারটা এমন দ্রুত গতিতে ঘটে যাবে।
উদ্যোক্তাদের তরফে সুবীর দেবনাথ বলেন, “কী করে পারব বলুন! মাত্র ছ’মাস আগে আমরা দেবশঙ্কর হালদারে দু’টি বিখ্যাত নাটক ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ এবং ‘ফুড়ুৎ’ এনেছিলাম। সে বারেও মানুষ খুব উৎসাহ নিয়ে নাটক দেখেছিলেন। কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত কাউন্টার খুলে রেখেও সমস্ত টিকিট বিক্রি হয়নি। সেই হিসাবে মাত্র তিন দিনে সব টিকিট এ ভাবে উড়ে যাবে কি করে আন্দাজ পারব বলুন।”
আর ঠিক এখানেই প্রশ্ন ঊঠছে তাহলে নবদ্বীপের মানুষ নাটক না কি তারকা দেখতে আসছেন? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেই কি টিকিট নিয়ে এই উন্মাদনা? উত্তরদাতারা স্পষ্টই দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছেন। একদলের সাফ কথা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখতে মানুষ আসছেন ঠিকই। কিন্তু সেটা মঞ্চাভিনেতা সৌমিত্রকে। অন্য কোন আকর্ষণে নয়। নবদ্বীপের বাপি চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, তারকা দেখতে হলে এখন লোকে সৌমিত্র নয় অন্য কাউকে খুঁজবেন। এর আগে নবদ্বীপের অস্থায়ী মঞ্চে সৌমিত্রবাবু ‘প্রাণ তপস্যা’ করে গিয়েছেন। তখনও মানুষ গিয়েছিলেন। তবে সেখানে এত লোকের দেখার সুযোগই ছিল না। এখন নতুন হলে নিয়মিত নাটক আসছে। লোকের একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এসব তারই ফল। নবদ্বীপ এমন কিছুর অপেক্ষাতেই ছিল।
একই মত চিত্রশিল্পী শুভেন্দু গুপ্ত কিংবা নাট্যকর্মী পল্লব রায়ের। তাঁদের মতে, নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য দেশজ নাট্যগীতির আঙ্গিক এবং বিষয় ভাবনার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। তার তিনশো বছর পরে নবদ্বীপে বসেই যাত্রাভিনয়ের আমূল সংস্কার করেন মোতিলাল রায়। তাঁকে বলা হয় আধুনিক যাত্রার রূপকার। এই শহরেই জন্মেছেন প্রখ্যাত পরিচালক নিতাই ভট্টাচার্য, ডাকসাইটে অভিনেতা অমর গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। সেই শহরে এমনটাই স্বাভাবিক। শুভেন্দুবাবু, পল্লববাবুরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন নবদ্বীপের নতুন মঞ্চ হওয়ার পরে প্রথম বড় দলের নাটক হিসাবে নান্দীকারের ‘মাধবী’ মঞ্চস্থ হওয়ার ঘটনা।
সে বার আয়োজক দলকে ‘টিকিট শেষ’ বলে মাইক বের করে টিকিট ফুরিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়। যা শুনে নান্দীকারের প্রধান রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের মন্তব্য ছিল, “নাটকের আদি পুরুষ খোদ চৈতন্যদেবের শহরে অভিনয়ের সুযোগ এবং এমন বিপুল মানুষের সাড়ায় আমরা অভিভূত। নান্দীকারের নাটক দেখবেন বলে মানুষের আগ্রহ দেখে তৃপ্তি হয়।”
তবে অন্যদিকে কেবল মাত্র সৌমিত্রকে একবার চোখের দেখা দেখতে চেয়ে প্রথম দিন সবচেয়ে বেশি দামের টিকিট কেটেছেন এমন মানুষও আছেন। মধ্য ষাটের দিব্যেন্দু রায়। পেশায় ব্যবসায়ী দিব্যেন্দুবাবু সাফ বলছেন, ‘‘সেই কোন ছোটবেলা থেকে নানা ছবিতে ওঁকে দেখে আসছি। এহেন মানুষটি আমার শহরে আসছেন, আর তাঁকে দেখতে যাব না, এ আবার হয় নাকি। দশ মিনিটের জন্য সামনাসামনি দেখতে পেলেও আমার বিরাট প্রাপ্তি।”
তবে টিকিটের বিপুল চাহিদা দেখে উদ্যোক্তারা ডবল শো’য়ের কথাও ভাবছেন। সেটা অবশ্য নির্ভর করছে অনেক কিছুর উপর। ডবল শো হোক বা নাই হোক, আপাতত মঙ্গলবার রাতেই শহরের ছাপাখানায় ‘টিকিট নিঃশেষিত’ লেখা ফ্লেক্স ছাপতে দেওয়া হয়েছে। বুধবার শহরের যেসব জায়গায় ‘ফেরা’-র পোস্টার পড়েছে সেখানে সেঁটে দেওয়া হবে। সঙ্গে বের হবে মাইক।
নাটক বা যে কোন বড় অনুষ্ঠানের প্রবেশপত্র উদ্যোক্তারা দর্শক শ্রোতাদের কাছে গিয়ে পৌঁছে দেবেন। এটাই এতদিন নবদ্বীপের প্রচলিত রেওয়াজ ছিল। চলতি কথায় একে ‘টিকিট পুশ’ বলা হয়। কিন্তু কলকাতা তো বটেই, কল্যাণী এমনকী পাশের শহর কৃষ্ণনগরেও বড় নাটকের অনুষ্ঠানে প্রবেশপত্র কাউন্টার থেকেই সংগ্রহ করেন দর্শকেরা। সমস্বর এবং ইন-ফরমেশনের উদ্যোক্তারা প্রথম থেকেই চেয়েছেন নবদ্বীপের নাট্যরসিকদের এই অভ্যাসটা গড়ে উঠুক। বলা বাহুল্য সেই অভ্যাসটা যে নবদ্বীপের মানুষ রীতিমতো রপ্ত করে ফেলেছেন তা বলার অপেক্ষা
রাখে না।