×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৬ মে ২০২১ ই-পেপার

বিয়ের তত্ত্বে সাজানো হয়েছে বড় বড় দোকানের পোশাক, বাইক থেকে ফ্রিজ, এসি, কাঁসা-পিতলের বাসন

নবদ্বীপে বুড়োশিবের বিয়েতে ভূরিভোজ

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়
নবদ্বীপ ০৭ এপ্রিল ২০১৭ ০১:১৭
সাজ: সেজেছে বুড়োশিবের মন্দির। — নিজস্ব চিত্র

সাজ: সেজেছে বুড়োশিবের মন্দির। — নিজস্ব চিত্র

তখনও বিজলিবাতি আসেনি নবদ্বীপে। সন্ধ্যা নামলেই কেরোসিন ল্যাম্পের ধোঁয়াটে ভুসো ওঠা আলোয় ঢেকে যেত ঘর গেরস্থালি। এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় রেড়ির তেলের ম্যাড়ম্যাড়ে ফ্যাকাশে আলোয় সেকালের নবদ্বীপে রাত ছিল বড় বিবর্ণ।

চৈত্রের এমনই এক মধ্যরাতে নগরের পথে তুমুল শোরগোলে ঘুম ভেঙে গেল নবদ্বীপের। চোখ ধাঁধানো এক বিয়ের বরযাত্রা চলেছে। সারি সারি মশাল ও গ্যাসবাতির রোশনাইয়ে ঝলমলে সেই শোভাযাত্রার সামনে সেকালের নবদ্বীপের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী তারাপদ বাগচি চলেছেন বরকর্তা হিসাবে। তাঁর ঠিক পিছনে একটা সুসজ্জিত পালকি। পালকির ভিতরে লাল মখমলের উপর বসানো রুপোর থালায় চুড়ো করে সাজানো রুপোর মোহর। উঠছে ঘুমন্ত শহর। বাকি শোভাযাত্রা জুড়ে ঠেলাগাড়িতে একের পর এক দৃশ্যপট সাজানো। দেবদেবীর মূর্তি, ভূত, পিশাচ, নকল বাগান। সঙ্গে বাজছে ঢাকঢোল, সানাই, ব্যান্ডের গান। চলছে নাচ। ফাটছে বাজি। রয়েছে চলমান ঝাড়লন্ঠন।

জানা গেল বাগচিমশাই ওই হাজার রুপোর মোহর কনে পক্ষের এক হাজার মানুষকে উপহার দেবেন। শুনে চমকে গেল নবদ্বীপের মানুষ। কিন্তু চমকের যে তখনও ঢের বাকি। পোড়া মা তলায় কনেপক্ষের বাড়ি পৌঁছে বাগচি মশাইয়ের অক্কেল গুড়ুম। সেখানে তখন তাঁদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে এক হাজার বাঈজি। আসলে মোহর উপহারের কথা আগেই কোনও ভাবে জেনে ফেলেছিল কনেপক্ষ। তাই বরপক্ষকে জবাব দেওয়ার জন্য হাজার বাঈজির পরিকল্পনা করেছিল কনেপক্ষ।

Advertisement



এ ভাবেই সেকালের নবদ্বীপে শিবের বিয়ে হত। বছরভর অপেক্ষা করতেন একটি রাতের আলোর রোশনাই দেখার জন্য। চৈত্রের শুক্লা দশমীর সেই রাত শিবের বিয়ের রাত বলেই পরিচিত। যদিও পঞ্জিকা মতে চৈত্র মাসে বিবাহ নাস্তি।

তার পর কেটে গিয়েছে অনেক বছর। কিন্তু শিবের বিয়ে নিয়ে নবদ্বীপের উন্মাদনা আজও একই রকম। এখন বুড়োশিবতলা, যোগনাথ তলা, চারিচারা পাড়া এবং বউ বাজারের যথাক্রমে বুড়োশিব, যোগনাথ, বালকনাথ এবং মালোদের শিবের বিয়ে হয় জাঁকজমকের সঙ্গে নিজের নিজের মন্দির লাগোয়া এলাকায়। মন্দিরের পাশে বিশাল মঞ্চ বাঁধা হয়। সেখানে সাজানো হয় শহরের বড় বড় দোকানের পোশাক থেকে আসবাব, সাইকেল থেকে কাঁসা-পিতলের বাসনপত্র। বাইক থেকে ফ্রিজ, এসি কিছুই বাদ থাকে না। শহরের বড় বড় দোকান থেকে ব্যবসায়ীরা আনন্দের সঙ্গে ওই সব জিনিস বিয়ের বাসর সাজাতে পৌঁছে দেন।

বৃহস্পতিবার শিবের বিয়ের রাতে বুড়োশিবতলায় হয়েছে ‘বুফে’-এর আয়োজন। ভোজের আয়োজনকারী স্থানীয় এক ক্যাটারিংয়ের মালিক নিতাই বসাক বলেন, “শিবের বিয়ের রাতে তিন হাজার জনের খাওয়ানোর ব্যবস্থা হয়েছে।” বুড়োশিবের খাওয়া শুরু হবে রাত সাড়ে ন’টায়। কিন্তু পুরোনো ঐতিহ্য মেনে যোগনাথের ভোজ বিয়ের পর শেষ রাতে।

Advertisement